স্কুলে একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা। কিংবা ইতালির রোদে পোড়া কোনো ভিলার বারান্দায় আইসক্রিম হাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য। কনল আর মারিয়ানের এই রসায়ন মানুষ কখনো দেখেছেন পর্দায় আবার কখনো পড়েছেন বইয়ের পাতায়। স্যালি রুনির উপন্যাসের পাতায় ও পর্দায় ফুটে ওঠা এই মুহূর্তগুলো যেন তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের এক নিখুঁত আয়না। ‘নরম্যাল পিপল’ বা ‘কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস’-এর মতো উপন্যাসের হাত ধরে আইরিশ এই ঔপন্যাসিক বিশ্বজুড়ে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। কোটি কোটি কপি বিক্রি হওয়া তাঁর বইগুলো মিলেনিয়াল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ বৈশ্বিক খ্যাতির সেই শিখরে দাঁড়িয়েই আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি সাহিত্যিক স্যালি রুনি। ভাবতে পারছেন? দোকানে থাকা শেষ কপিগুলো বিক্রি হওয়ার পর ব্রিটিশ বাজারে আর মিলবে না তাঁর কোনো বই।
প্রকাশকদের সঙ্গে যৌথ সম্মতিতে যুক্তরাজ্যে স্যালির বইয়ের নতুন সরবরাহ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ তাঁর উপন্যাসের রয়্যালটি সরাসরি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের খাঁড়ায় পড়েছে। আয়ারল্যান্ডের ক্যাসলবারের এক সাধারণ বইপ্রেমী পরিবারে বেড়ে ওঠা স্যালি রুনি ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ট্রিনিটি কলেজে পড়ার সময় বিতর্কে দারুণ পারদর্শী এই তরুণী মার্ক্সীয় ভাবাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। ২০১৭ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস প্রকাশের পর থেকেই সাহিত্যজগতে ঝড় ওঠে। আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম, চ্যাট ও ইমেইলের ভাষা মুনশিয়ানার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার কারণে তাঁকে বলা হতে থাকে ‘স্ন্যাপচ্যাট প্রজন্মের স্যালিঞ্জার’। মারিয়ান কিংবা কনল চরিত্রের মাধ্যমে তিনি মানুষের জটিল সম্পর্ক ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ পাঠকদের মন ছুঁয়ে গেছে। কিন্তু নিজের এই বিপুল সাফল্য ও অর্জিত অর্থকে তিনি কখনো কেবল ব্যক্তিগত বিলাসের হাতিয়ার করেননি। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি সংহতিতে তিনি তা ব্যবহার করেছেন।
এখানেই তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য সরকার সরাসরি প্রোটেস্ট গ্রুপ ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের কারখানায় ঢুকে ভাঙচুর ও লাল রং ছিটানোর প্রতিবাদী কৌশলের সঙ্গে জড়িত এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার পর যুক্তরাজ্য কঠোর সন্ত্রাসবাদ আইন প্রণয়ন করে। আয়ারল্যান্ডে সংগঠনটি বৈধ হলেও রুনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, তাঁর বই ও বিবিসির সিরিজ থেকে পাওয়া রয়্যালটি তিনি এই সংস্থাকেই দেবেন। আইন অনুযায়ী, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের কাজে যেতে পারে এমন কোনো ব্যক্তিকে অর্থ বা রয়্যালটি পাঠানো যুক্তরাজ্যে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
এর শাস্তি হতে পারে ১৪ বছরের কারাদণ্ড। ফলে প্রকাশনা সংস্থা ‘ফেবার অ্যান্ড ফেবার’ আইনি বাধ্যবাধকতার মুখে পড়ে। লেখককে তাঁর প্রাপ্য সম্মানী বা আয় না দিয়ে বই বিক্রি চালিয়ে যাওয়া প্রকাশকের কাছে সম্পূর্ণ বিবেকবিরুদ্ধ মনে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারি বা আদালতের সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আদেশে নয়, এই আইনি বেড়াজালের কারণেই প্রকাশক ও লেখক উভয়ের সমঝোতায় যুক্তরাজ্যে রুনির বইয়ের সমস্ত নতুন সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দোকানে থাকা শেষ কপিগুলো বিক্রি হওয়ার পর ব্রিটিশ বাজারে আর মিলবে না তাঁর কোনো বই।
বিশ্বের কোটি কোটি পাঠকের হৃদয় জয় করা একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিকের বই বন্ধ হওয়া নতুন নয়। তবে কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্যাঁচে পড়ে প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই ঘটনাটি বর্তমান বিশ্বের বাক্স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির ওপর এক নজিরবিহীন আঘাত। স্যালি রুনির উপন্যাসের চরিত্ররা সমাজের প্রচলিত কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তেমনি তাঁর নিজের বাস্তবজীবনও আজ রাষ্ট্রীয় আইনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক গভীর ও জটিল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ইনডিপেনডেন্ট, ডেডলাইন, ভোগ
