ছবির ক্যাপশন: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস।
>> মো.মাসুদ আলম (সাগর), ব্যুরো প্রধান, চট্টগ্রাম
পাসপোর্ট করার প্রক্রিয়ায় পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের প্রয়োজনীয়তা তুলে নেওয়ার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস যে কালজয়ী পদক্ষেপ নিয়েছেন,তা শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে,বরং এটি একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আর পুলিশের কাছে হয়রানির শিকার হবে না এবং পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য এখন আর কোনও অবৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে না। পুলিশ রিপোর্টের অবৈধ প্রথা এবং ঘুষঃ বাণিজ্য -পাসপোর্টের জন্য পুলিশের রিপোর্ট নিয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে। তবে,এটি ছিল এক ধরনের অবৈধ প্রথা যা দেশের সাধারণ মানুষকে গুরুতর বিপদে ফেলত। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বিভাগে, যেখানে পুলিশ এর মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনা করত, পাসপোর্টের প্রক্রিয়া যেন একমাত্র পুলিশের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে চলে আসত। পুলিশের কাছ থেকে রিপোর্ট নিতে গিয়ে নাগরিকরা দালালদের সাহায্য নিতে বাধ্য হতো, এবং প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য পুলিশকে মোটা অংকের ঘুষ দিতে হতো। এমনকি পুলিশ যদি চাইত না, তবে পাসপোর্টের আবেদনকারীকে নানা হয়রানির শিকার হতে হতো, যার ফলে অনেকেই হয়রানির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট পেতেন না। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি চট্টগ্রাম বিভাগের মানুষের জন্য পুলিশ রিপোর্টের সমস্যা আরও প্রকট ছিল। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে চট্টগ্রামে পাসপোর্ট ইস্যু করার সময় পুলিশ যথেষ্ট কঠোর ছিল। পুলিশ কিছুটা সতর্ক থাকত এবং সহজে পাসপোর্ট ইস্যু করত না,যা সাধারণ মানুষের জীবনে বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছিল।
এছাড়া, যারা টাকা দিতে না পারতেন, তাদের পাসপোর্টের জন্য নেগেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হতো। পুলিশ এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে নানাভাবে অর্থ আদায় করত। মামলা থাকা অবস্থায় পাসপোর্ট পাওয়াঃ একটি সময় এমন একটি নীতি প্রচলিত ছিল যে, যার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে,তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হতো না। তাতে কিছুটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের পাসপোর্ট পেতে বাঁধা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু, সরকার বা পুলিশ যে কোনো মামলা দায়ের করার মাধ্যমে একজন নির্দোষ ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বিরোধী দলকে হয়রানির শিকার করার সুযোগ পেতো। এটি ছিল একটি অযৌক্তিক এবং অবৈধ নিয়ম,যেখানে মামলার সত্যতা যাচাইয়ের আগেই পাসপোর্ট ইস্যু বন্ধ করা হতো ই-পাসপোর্টের সমস্যাঃ বর্তমানে দেশে ই-পাসপোর্ট চালু হলেও এর সাথে সম্পর্কিত অনেক সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে,প্রবাসীদের জন্য এই ই-পাসপোর্টের প্রক্রিয়া জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও,অনেক প্রবাসীর পরিচয়পত্র নেই বা তাদের পুরনো তথ্যের সাথে নতুন পাসপোর্টের তথ্য মেলানো যায় না। এর ফলে অনেকেই নতুন পাসপোর্ট পেতে সমস্যায় পড়ছেন। তাছাড়া,পুলিশ রিপোর্টের প্রথা এখনও অনেকের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়েছে,যার ফলে তারা নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।এই অবস্থা সমাধান করার জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনুস সাহেবের এই সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত দরকারি ছিল।
একবারের সমস্যা নয়,বরং বছরের পর বছর এসব মানুষকে এই বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। পাসপোর্ট না পাওয়ার ফলে তারা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ,বিদেশে পড়াশোনা, কাজ বা চিকিৎসার জন্য যেতে পারেন না, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে কমিয়ে দেয়। সরকারের উচিত,এসব সমস্যার সমাধান দ্রুত খুঁজে বের করে এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।পাসপোর্ট অফিসে ঘুষ বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধের সাধারণ মানুষের দাবিঃ বাংলাদেশে পাসপোর্ট অফিসে হাজার হাজার কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের ঘটনা এখন একটি উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাসপোর্ট করার জন্য যারা আবেদন করেন, তাদের মধ্যে অনেকেই পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য পুলিশের কাছ থেকে অবৈধভাবে রিপোর্ট সংগ্রহের জন্য মোটা অংকের ঘুষ দিতে বাধ্য হন। এ প্রক্রিয়াটি শুধু অবৈধ নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের হয়রানি এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।ঘুষের অঙ্গীকার এবং পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য দুর্ভোগঃ পাসপোর্ট পেতে চাওয়ার সময় সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে একাধিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। যেহেতু পুলিশ রিপোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত,তাই পাসপোর্টের জন্য পুলিশের কাছ থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষ ঘুষ প্রদান করতে বাধ্য হন। পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য প্রতি পাসপোর্টের জন্য হাজার হাজার টাকা ঘুষ আদায় করতেন। বিশেষ করে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো নাগরিক যদি সরাসরি পুলিশের কাছে যান,তাদেরকে নানা ধরনের প্রশ্ন এবং হয়রানির মধ্যে ফেলত।
এছাড়া, পুলিশ রিপোর্টের নামে অনেক প্রবাসীও ঘুষ দিয়ে পাসপোর্ট পেতে বাধ্য হন। এমনকি অনেক সময় কোনো সমস্যাহীন নাগরিকও রিপোর্ট পেতে না পেরে পাসপোর্টের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো।এছাড়া, সাধারণ নাগরিকদের জন্য পাসপোর্টের জন্য সময়মত আবেদন করা, জমা দেওয়া এবং নিশ্চিত রিপোর্ট নেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো ব্যক্তি পাসপোর্ট পেতে চাইলে তাকে একটি দালালের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হতো। তাতে আরও বাড়ে অবৈধ অর্থ লেনদেনের পরিমাণ। প্রবাসীদের জন্য সহজ এবং স্বচ্ছ পাসপোর্ট প্রক্রিয়াঃ বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাসপোর্ট নিয়ে আরও অনেক সমস্যায় পড়েন। অনেক প্রবাসী যারা জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট চান,তাদের জন্য সময়মত পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। এর কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, বিশেষ করে ভিসা জটিলতা বা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে। বহু প্রবাসী এমন অভিযোগ করেন যে,তারা পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার পরেও নানা দেরি এবং অতিরিক্ত হয়রানির কারণে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেননি বা কাজে যোগ দিতে পারেননি। এছাড়া,জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া যেন আরও সহজ ও দ্রুত হয়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি একাধিকবার উঠে এসেছে।
পাসপোর্ট পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা এবং প্রতিকারঃ বাংলাদেশে পাসপোর্ট প্রাপ্তির জন্য একটি সহজ এবং দ্রুত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সিদ্ধান্তের মতো, পাসপোর্ট অফিসে ঘুষ লেনদেন বন্ধ করতে আরও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রবাসী নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট প্রাপ্তির সময়সীমা কমিয়ে আনতে এবং তারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই পাসপোর্ট পেতে পারেন, তার জন্য প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট এবং স্বচ্ছ করতে হবে। অতএব, সরকারের কাছে প্রবাসীরা একটি অনুরোধ জানাচ্ছেন—পাসপোর্ট অফিসে অবৈধ ঘুষ বাণিজ্য,পুলিশ রিপোর্টের নামে হয়রানি এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বন্ধ করা হোক। সরকারের উচিত, এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যাতে জরুরি ভিত্তিতে যারা পাসপোর্ট প্রয়োজন, তারা তাড়াতাড়ি এবং কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা ছাড়া পাসপোর্ট পেতে পারেন।বিশেষত প্রবাসীদের জন্য একটি সহজ, স্বচ্ছ এবং দ্রুত পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে হবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক যাত্রার জন্য বাধাহীন ব্যবস্থা প্রদান করবে। পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি বন্ধ এবং জনগণের পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
