আজকাল ওয়েবডেস্ক: ১৩ বছর কাজের পর ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (আইএএস) থেকে ইস্তফা দিয়েছেন দিব্যা মিত্তল। প্রাক্তন এই আইএএস বৃহস্পতিবার নিজের রাজনৈতিক দল ‘জন-নীতি ভারত পার্টি’ গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর দল ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় (এক্স-সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে) পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় দিব্যা মিত্তল তাঁর দলের তিনটি মূল প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- জনগণকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ, পরিচয়ের পরিবর্তে প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, “আমি আমার নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করছি... ‘জন-নীতি ভারত পার্টি’। এই দল ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে লড়বে।”
দলের প্রথম প্রতিশ্রুতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দিব্যা মিত্তল জানান, নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রে থাকবেন সাধারণ মানুষ এবং নীতি তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দলের মূলমন্ত্র হবে— “জন সে নীতি, নীতি সে ভারত” (জনগণের দ্বারা নীতি, যে নীতির মাধ্যমে ভারত গড়ে ওঠে)।
দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতির বিষয়ে প্রাক্তন আইএএস বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিচয়ের চেয়ে প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই নীতির মূলমন্ত্র হল— “জরুরত সে ফয়সলা, ফয়সলে মেঁ বরাবরি” (প্রয়োজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমতা)।
তৃতীয় প্রতিশ্রুতিটি হল জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। দিব্যা বলেন, “হর কাম কা হিসাব জনতা লেগি” (প্রতিটি কাজের হিসাব জনগণই নেবে)। এই নীতির মূলমন্ত্র হল- “জনতা কো হিসাব, হিসাব সে সুধার” (জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, দায়বদ্ধতার মাধ্যমেই সংস্কার)।
দিব্যা মিত্তলের রাজনৈতিক পরিকল্পনা
২০১৩ ব্যাচের উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের এই আইএএস গত মাসে একটি ভিডিও বার্তায় জানিয়েছিলেন যে, তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে কাজ করতে এবং তাঁদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে রাজনীতিতে আসতে চান। বলেছিলেন, “আমি রাজনীতি করব, তবে কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়। আমি মানুষের সঙ্গে রাজনীতি করব।”
উত্তর প্রদেশকে নিজের ‘কর্মভূমি’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি জানান, এই রাজ্য থেকেই তিনি তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করবেন। জনগণের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তিনি তাঁদের সঙ্গে নিয়ে “নির্ভয়ে লড়াই” চালিয়ে যাবেন।
মিত্তাল একটি ফোন নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের নম্বরও শেয়ার করেছেন। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, যাঁরা তাঁর বার্তার সঙ্গে একমত, তাঁরা যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর এই উদ্যোগে শামিল হন।
গত ৩০ আগস্ট আইএএস থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার প্রায় দু'মাস পর এই ঘোষণা এল। উত্তর প্রদেশ সরকার ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে, যার ফলে সিভিল সার্ভিসে তাঁর ১৩ বছরের কর্মজীবনের অবসান ঘটে।
কে এই দিব্যা মিত্তাল?
মূলত হরিয়ানার রেওয়ারির বাসিন্দা মিত্তাল আইআইটি দিল্লি ও আইআইএম ব্যাঙ্গালোরে পড়াশোনা করেছেন। এমবিএ সম্পন্ন করার পর তিনি লন্ডনে কাজ করেছেন। এরপর ভারতে ফিরে এসে ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন।
২০১৩ সালে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ৬৮তম স্থান অর্জন করে আইএএস-এ যোগ দেন। তিনি সন্ত কবির নগর, মির্জাপুর ও দেওরিয়ায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া উত্তর প্রদেশ সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদেও তিনি আসীন ছিলেন। এর মধ্যে রাজস্ব বিভাগের ‘স্পেশাল সেক্রেটারি’-র দায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত।
মির্জাপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন মিত্তাল ব্যাপক পরিচিতি পান। সে সময় তাঁর প্রশাসন ‘লাহুরিয়া দাহ’ নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামে পাইপলাইনের মাধ্যমে শুদ্ধ জল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। অথচ ওই গ্রামের বাসিন্দারা কয়েক দশক ধরে জলের জন্য ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি কৃষক, জমির অধিকারপ্রত্যাশী পরিবার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, প্রশাসনিক কর্মজীবন তাঁকে শিখিয়েছে যে, “প্রতিটি সরকারি ফাইলের পেছনে একজন মানুষ থাকেন।”
আইএএস-এ ১৩ বছর কাটানোর পর রাজনীতিতে মিত্তাল
আইএএস থেকে পদত্যাগের পর থেকেই মিত্তালের রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিল। তখন তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু জানাননি, কেবল বলেছিলেন যে সঠিক সময়ে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন। পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনার কথা উঠে আসে, বিশেষ করে সেই সব এলাকায়, যেখানে তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর সাম্প্রতিক ঘোষণায় স্পষ্ট হয় যে, তিনি কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে আগ্রহী। দিব্যা জানিয়েছেন যে, তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চান এবং উত্তরপ্রদেশে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করতে চান।
২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন এগিয়ে আসায়, তাঁর এই ঘোষণার মাধ্যমে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটল। তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, তবে তিনি এখনও প্রকাশ করেননি যে, তিনি নিজে কোন নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে লড়বেন।
