মৃতদেহের পাশে ভনভন করা মাছিই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুরহস্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র! সেই মাছির প্রজাতি চিহ্নিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা নিয়ে গবেষণায় উঠে এল বাঁকুড়ার সোনামুখীর নাম। পশ্চিমবঙ্গের চারটি ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে প্রায় তিন হাজার মাছি সংগ্রহ করে এই গবেষণা চালিয়েছেন কলকাতার জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে ক্রাইসোমিয়া মেগাসেফালা নামে এক প্রজাতির মাছি, যা মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা ‘পিএলওএস ওয়ান’-এ প্রকাশিত হয় গবেষণাটি। গবেষকদের তালিকায় রয়েছেন ওয়াইশিক কর, অর্ক মুখোপাধ্যায়, কৌস্তভ মুখোপাধ্যায়, দেবদীপ প্রামাণিক, অতনু নস্কর ও ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়। গবেষণার জন্য মোট ২ হাজার ৯৭৭টি মাছি সংগ্রহ করা হয়। সেগুলিকে শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখে শনাক্ত করার পরে নির্বাচিত ৫২টি নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। গবেষণাপত্রে সোনামুখী থেকে সংগ্রহ করা ক্রাইসোমিয়া মেগাসেফালা প্রজাতির মাছির নমুনার উল্লেখ রয়েছে।
কীভাবে চলে এই গবেষণা? বিভিন্ন এলাকা থেকে পচনশীল প্রাণিজ পদার্থের টোপ ব্যবহার করে মাছি সংগ্রহ করেন বিজ্ঞানীরা। তার পরে নমুনাগুলি সংরক্ষণ করে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার গবেষণাগারে। সেখানে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে মাছির শরীরের গঠন পরীক্ষা করে প্রাথমিক ভাবে প্রজাতি চিহ্নিত করা হয়। এরপর মাছির পা থেকে বংশগত উপাদান সংগ্রহ করে ডিএনএ-র একটি নির্দিষ্ট অংশ পরীক্ষা করা হয়। এই পদ্ধতির নাম ‘ডিএনএ বারকোডিং’। সহজ কথায়, ডিএনএ-র সাহায্যে মাছির পরিচয় যাচাই করা হয়।
কিন্তু অপরাধ তদন্তে মাছির গুরুত্ব কোথায়? কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর পরে মৃতদেহে মাছি ডিম পাড়তে পারে। সেই ডিম থেকে জন্মানো লার্ভা ধীরে ধীরে বড় হয়। মাছির প্রজাতি, লার্ভার বিকাশের পর্যায় এবং পরিবেশের তাপমাত্রা বিচার করে মৃত্যুর পর কতটা সময় কেটেছে, তার একটি আনুমানিক হিসাব করতে পারেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞেরা। তবে শুধু মাছির ডিএনএ পরীক্ষা করে মৃত্যুর সঠিক সময় নির্ধারণ করা যায় না। অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণও খতিয়ে দেখতে হয়।
মাছির লার্ভা নিয়ে বাঁকুড়ায় এর আগেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বিরল ঘটনা সামনে এসেছিল। ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ২২ বছর বয়সি এক মহিলার যোনিতে মাছির লার্ভা পাওয়ার কথা জানানো হয়। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজের প্রভাতচন্দ্র মণ্ডল ও বরুণোদয় চক্রবর্তী এবং সোনামুখী কলেজের শান্তনু মাহাতো ও শুভ্রকান্তি সিনহা ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
প্রতাপচন্দ্র মণ্ডল বলেন, “পরীক্ষাগারে লার্ভাগুলিকে পূর্ণাঙ্গ মাছিতে পরিণত করে গবেষকেরা ক্রাইসোমিয়া মেগাসেফালা প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করা হয় । ওই ঘটনায় অবশ্য ডিএনএ পরীক্ষার উল্লেখ ছিল না।” চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেই ঘটনা এবং মাছির ডিএনএ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা সম্পূর্ণ আলাদা হলেও দু’টি ক্ষেত্রেই মাছির প্রজাতি নির্ভুলভাবে চেনার গুরুত্ব সামনে এসেছে। সাধারণ চোখে তুচ্ছ মনে হওয়া এই পতঙ্গই চিকিৎসা ও অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। সোনামুখী থেকে সংগৃহীত মাছির নমুনার উল্লেখ সেই গবেষণায় বাঁকুড়ার নামও জুড়ে দিল।
