রাজতন্ত্র নেই। নেই সেই রাজ-রাজাদের আমলের জৌলুস। হারিয়ে গিয়েছে রাজবাড়ির চাকচিক্য। জঙ্গলের মধ্যে যেন পোড়ো বাড়ি হয়ে রয়েছে! কিন্তু সেই পোড়ো বাড়িতেই মা আসেন। আর মাকে ঘিরে রাজবাড়িতে দেখা যায় একদিনের রাজা-রানিকে। যদিও পুরুলিয়ার (Purulia) ঝালদা ১ ব্লকের রাজাহেঁসলা গ্রাম-সহ কর্মাডি, পারডি, নিমডি, কনকপুরের মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষজন এই রাজবাড়ির শেষ রাজা রামকিঙ্কর সিং দেও-র ছেলে কন্দর্পনারায়ণ সিং দেওকে রাজা বলে মানেনও! আর তাই এই অঞ্চলের কারও কোনও ঝামেলা, সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানে রাজার কাছেই যান। কার্যত রাজার উপস্থিতিতে বিচারসভা বসে। সেখানে নিষ্পত্তি না হলে পঞ্চায়েত, থানা বা আদালতে যান গ্রামবাসীরা।
হাতি উপদ্রুত ঝালদার ডুঙরাবুরু পাহাড় ছুঁয়ে ওই রাজবাড়ি। পাশেই ভাঙাচোরা কাছারি ঘর। যেখানে কর সংগ্রহ হত। জমি রেজিস্ট্রির নানা কাজ চলত। সেই সঙ্গে বসত বিচারসভা। তবে এখন আর ওই কাছারি বাড়িতে বিচারসভা বসে না। তা বসে রাজবাড়ির বৈঠকখানায়। পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এই রাজবাড়ির ইতিহাস। আর তার সঙ্গে মায়ের পুজো দেখতে ভিড় জমান পর্যটকরাও। পুজোর দিনগুলিতে হাতি মোকাবিলায় এই রাজবাড়ির আশপাশে মোতায়েন থাকেন বন কর্মীরা। পাশেই যে অযোধ্যা পাহাড়ের দীর্ঘ রেঞ্জ!
প্রায় ১২০০ বছরের প্রাচীন রাজাহেঁসলা রাজপরিবার। প্রথম বংশধর দিগ্বিজয় প্রতাপ সিং দেও যোধপুর থেকে আসেন ইলুতে। সেখানেই ছিল তাঁর রাজধানী। প্রথমে তিনি ঘটে মায়ের আরাধনা শুরু করলেও পরবর্তীকালে প্রতিমা গড়েন। এই মাতৃপ্রতিমার বিষয়টি এলাকার মানুষজনের কাছে বিশদে তুলে ধরতে নাচের আয়োজন করেন। কেউ হন শিব-দুর্গা। আবার কেউ সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক। এই নাচে ফুটে ওঠে মহিষাসুরমর্দিনী। কথিত আছে, এই রাজপরিবার থেকেই শুরু হয়েছিল মানভূমের ছৌ নাচ।
ইলুতে ৬ বছর ছিল রাজত্ব। তারপর ৬ বছর ধরে রাজাহেঁসলায়। মোঘলদের আক্রমণ হয়েছিল ইলুর রাজবাড়িতে। তাঁদের গুলি- বারুদ সুবর্ণরেখা নদীর চরে থাকায় আচমকা বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে লড়াই করতে পারেননি তাঁরা। সেই রাগে তাতে আগুন লাগিয়ে চলে যায়। ওই ঘটনার পর সাম্রাজ্য স্থানান্তর হয় রাজাহেঁসলা গ্রামে। পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেবের আমলে আবার সেই ইলুতে হামলা হয়েছিল। সেখানে যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা ওই হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। তাই পুরোহিতরা বলেছিলেন, ওই এলাকা অশুভ। এদিকে আর মুখ তুলে তাকাবেন না। সেই থেকে রাজাহেঁসলাতেই চলছে সাম্রাজ্য। বর্তমানে রাজতন্ত্র না থাকলেও রাজা একেবারে বহাল তবিয়তে। কন্দর্পনারায়ণ সিং দেও বলেন,
“বিজয়া দশমীর দিনে ঘট বিসর্জনের পরে আমরা আবার মন্দিরে ফিরে আসি। সেই মন্দিরে ফিরে আসার পরে আমার মাথায় পুরোহিত পাগড়ি বাঁধেন। বেলপত্র গলায় দেন।”
এরপর রাজা ঠাকুরবাড়িতে চলে যান। সেই ঠাকুরবাড়িতে তাদের কুলদেবতা রাধা-রানি থাকেন। আর সেখানে থাকেন পর্দানশীন রানি মা অনিতা সিং দেও। সারা বছর তিনি কাউকে দেখা দেন না। এমনকি যখন তিনি পুজো করতে দুর্গাদালানে আসেন তখন সদর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি যতক্ষণ থাকেন তখন গ্রামের মানুষ কেউই আসতে পারেন না। ঠাকুর বাড়িতে স্ত্রীর মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দেন রাজা। পুরোহিত শান্তির জল দেন। তখন থেকেই শুরু হয় বিজয়া দশমী। রানি মাকে দেখতে পান সকলেই। রাজাহেঁসলা গ্রামের বাসিন্দা তথা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পঞ্চানন সিংহ, গৌউর কুইরি বলেন, “এখন সকলেই স্বাধীন। রাজতন্ত্র বলে কিছু নেই। কিন্তু কন্দর্পনারায়ণকে আমরা রাজা বলেই মানি। কোনও সমস্যা হলে আমরা তাঁর কাছেই আসি। তারপর সেখানে নিষ্পত্তি না হলে পঞ্চায়েত, আদালতে যাই।”
