বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অডিট বিভাগের যুগ্মনিয়ন্ত্রক (অডিট) পদে চলতি দায়িত্বে থাকা মো. আল-আমিনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর জারি করা ওই নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন বিএডিসির সচিব আবু জাফর রাশেদ। এতে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক দাপ্তরিক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা কেন নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
নোটিশ অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর একটি প্রকল্পের কার্যালয়ে মূল্যায়ন কমিটির সভাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ওই সভায় তাকে সভাপতি করা না হওয়ায় প্রকল্প পরিচালককে উদ্দেশ করে অশোভন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ৪ অক্টোবর প্রকল্পের অডিট ও টেন্ডার মূল্যায়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে তার আচরণ নিয়ে একাধিক অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ
আল-আমিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে MIEFP প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) কার্যক্রম ঘিরে। বিএডিসির কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়েছে, গত ৪ অক্টোবর দরপত্র মূল্যায়নের সময় আল-আমিন সংশ্লিষ্ট কক্ষে গিয়ে তাকে টিইসির সভাপতি করা হয়নি কেন, তা নিয়ে আপত্তি জানান। ড. মো. শাফায়েত হোসেনকে কমিটির সভাপতি করায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান এবং তাকে সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করানোর হুমকি দেন বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে আল-আমিন মোবাইল ফোনে কয়েকজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সেখানে আসতে বলেন। পরে তিনি দরপত্র মূল্যায়নে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ নিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ল্যাপটপটি নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে এখতিয়ারবহির্ভূত আচরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি দরপত্র মূল্যায়নের মতো সংবেদনশীল কার্যক্রমে ব্যবহৃত ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে তথ্যের নিরাপত্তা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ ঘটনায় ল্যাপটপে থাকা তথ্যের নিরাপত্তা বা দরপত্র মূল্যায়নে কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
দাপ্তরিক এলাকায় বহিরাগত ডাকার অভিযোগ
কারণ দর্শানোর নোটিশে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিবের কক্ষে বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কমিটির সদস্যরা কক্ষে অবস্থানকালে একজন অপরিচিত ব্যক্তি দরজা ঠেলে ‘শাফায়েত কে?’ জানতে চান। পরে অন্য কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে ওই ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান।
ওই ব্যক্তি কে ছিলেন, কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কার নির্দেশে দাপ্তরিক এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ
নোটিশে গত ৩০ জুনের একটি ঘটনার বিবরণও রয়েছে। অডিট-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় আল-আমিন নিয়ন্ত্রক (অডিট)-এর কক্ষে গিয়ে কর্মশালা ও ত্রিপক্ষীয় সভা সম্পর্কে তাকে কেন অবহিত করা হয়নি, তা জানতে চান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, দোষারোপ করা এবং সভা করতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই ঘটনায় সদস্য পরিচালক (অর্থ) ও চেয়ারম্যান সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সদস্য পরিচালক (অর্থ)-এর দপ্তরে অডিট-সংক্রান্ত একটি নথি ছুড়ে মারার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব আচরণকে দাপ্তরিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ।
অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিতি ও কৈফিয়তপত্র ছেঁড়ার অভিযোগ
আল-আমিনের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। নোটিশে ৬ আগস্টের একটি স্মারকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি ৩০ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগ করা হয়েছিল বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে কৈফিয়ত তলবের চিঠি পাওয়ার পর সেটি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের ডেকে এনে নিয়ন্ত্রক (অডিট)-এর সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
চেয়ারম্যানের দপ্তরে কর্মকর্তাদের ডাকা নিয়েও আপত্তি
গত ৪ অক্টোবরের আরেকটি ঘটনায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের দপ্তরে ডেকে তথ্য নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশ অনুযায়ী, এ সময় আল-আমিন চেয়ারম্যানের কক্ষে গিয়ে তাকে না জানিয়ে কেন ওই কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছে এবং তাদের কাছে কেন তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কর্তৃপক্ষ তার এ আচরণকে গুরুতর অসদাচরণ ও অপেশাদার আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বদলি-পদায়ন ও টেন্ডার নিয়ে আরও অভিযোগ
টেন্ডারসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি বিএডিসির বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে আল-আমিনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোন কর্মকর্তা কোথায় বদলি বা পদায়িত হবেন, সে বিষয়ে তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডারসংক্রান্ত বিষয়েও তার সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা।
এ ছাড়া টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কাজে হস্তক্ষেপ, ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগও রয়েছে। আল-আমিন বিএডিসির ‘জিয়া পরিষদ’-এর সভাপতি হিসেবেও পরিচিত।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
বিভাগীয় ব্যবস্থা নির্ভর করছে জবাবের ওপর
বিএডিসির কারণ দর্শানোর নোটিশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর সংশ্লিষ্ট বিধির উল্লেখ করে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে জবাব না দিলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
তবে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া বা শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাব, অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ এবং পরবর্তী বিভাগীয় কার্যক্রমের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আল-আমিনের বক্তব্য এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএডিসি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
