সেপসিস মানে রক্তদূষণ। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট একটি জীবনহানিকর অবস্থা হলো সেপসিস। এ অবস্থায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিডনি, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু না করলে সেপসিস থেকে মাল্টিঅর্গান ফেইলিউর (একাধিক অঙ্গ বিকল), সেপটিক শক এবং মৃত্যুও হতে পারে।
সেপসিস কেন হয়?
ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা অন্যান্য জীবাণুর সংক্রমণ জটিল আকার ধারণ করলে সেপসিস হতে পারে। সাধারণত শরীরের কোনো এক স্থানে সেপসিস শুরু হয়। পরে এর বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার কারণে বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নিউমোনিয়া সেপসিসের অন্যতম সাধারণ কারণ। কিডনি বা মূত্রনালির সংক্রমণ থেকেও সেপসিস হতে পারে। পেরিটোনাইটিস, অন্ত্রের সংক্রমণ, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের মতো পেটের ভেতর সংক্রমণ থেকেও সেপসিস হতে পারে। এ ছাড়া সেলুলাইটিস, সংক্রমিত ক্ষত, মেনিনজাইটিস, অস্ত্রোপচার–পরবর্তী সংক্রমণ কিংবা ক্যাথেটার-সম্পর্কিত সংক্রমণ থেকেও সেপসিস হতে পারে।
সেপসিসের ধরন
তীব্রতা অনুযায়ী সেপসিসকে সাধারণত তিনটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা হয়।
সাধারণ সেপসিস: এটি প্রাথমিক পর্যায়, যখন কোনো সংক্রমণ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। রক্তে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার নাম সেপ্টিসেমিয়া। সেপ্টিসেমিয়া থেকেই সেপসিস হয়। সেপসিস কিন্তু শুধু রক্তে জীবাণু প্রবেশের বিষয় নয়। রক্তের কালচার নেগেটিভ হলেও সেপসিস হতে পারে।
তীব্র সেপসিস: যখন প্রদাহের কারণে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে শুরু করে, রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। সংক্রমণের উপস্থিতিতে শরীরের এক বা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অকার্যকর হতে শুরু করলে তাকে বলা হয় তীব্র বা গুরুতর সেপসিস।
সেপটিক শক: এটি সেপসিসের সবচেয়ে মারাত্মক ও বিপজ্জনক ধাপ। এ ধাপে রোগীর রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়। কেবল ফ্লুইড বা স্যালাইন দিয়ে এটাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনা সম্ভব হয় না। এর ফলে রক্তসঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়ে একাধিক অঙ্গ একযোগে অকেজো হয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী, বর্তমানে চিকিৎসাক্ষেত্রে তীব্র সেপসিস শব্দটি আলাদাভাবে আর ব্যবহার করা হয় না। যেকোনো সেপসিস মানেই এখন জীবনঘাতী ধরে নিতে হবে। কারণ, সেপসিসে অঙ্গ অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রাথমিক লক্ষণ

সংক্রমণের পাশাপাশি নিচের যেকোনো দুটি লক্ষণ থাকলে সেপসিস হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধরে নিতে পারেন।
শরীরের তাপমাত্রা ১০০ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি অথবা ৯৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কম।
হৃৎস্পন্দন বা হার্ট রেট প্রতি মিনিটে ৯০ বারের বেশি।
শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি প্রতি মিনিটে ২০ বারের বেশি।
অঙ্গ অকার্যকারিতার লক্ষণ
সেপসিসের লক্ষণগুলোর সঙ্গে যখন দেখা যায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গও ঠিকমতো কাজ করছে না, তখনই ধরে নেওয়া হয় তীব্র সেপসিস। যেসব লক্ষণ দেখলে বোঝা যাবে যে অঙ্গ অকার্যকর হচ্ছে—
মস্তিষ্ক: রোগী প্রচণ্ড বিভ্রান্ত বোধ করে, কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে পড়ে, অচেতন হয়ে পড়তে পারে। এসব সমস্যা মানে মস্তিষ্ক অকার্যকর হচ্ছে।
কিডনি: প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে শুরু করলে বুঝবেন কিডনি বিকল হতে শুরু করেছে।
ফুসফুস: তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মনে করতে হবে যে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রক্তসংবহন ও লিভার: জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে, রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা দ্রুত কমে যেতে থাকে, রক্তে ল্যাকটেটের পরিমাণ বেড়ে যায়।
রক্তসংবহনতন্ত্র: সিস্টোলিক রক্তচাপ ৯০ মি.মি. পারদের নিচে নেমে গেলে বুঝতে হবে যে শরীরে রক্ত চলাচলব্যবস্থা বন্ধ হতে শুরু করছে।
কাদের ঝুঁকি বেশি
বয়স্ক ব্যক্তি, নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা নারী, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কিডনি বা লিভারের রোগী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের সংত্ক্রমণ হলে সেপসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সেপসিসের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

সেপসিস একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। তাই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি রেখে প্রয়োজনে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা দিতে হবে। এমন রোগীকে যে ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়—
১. অ্যান্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াজনিত সেপসিস সন্দেহ হলে দ্রুত শিরায় প্রয়োগযোগ্য উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। সংক্রামক জীবাণুটিকে শনাক্ত করতে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তের কালচার করা হয়। কালচার রিপোর্ট, সংক্রমণের উৎস, স্থানীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ধরন ও রোগীর কিডনির কার্যক্ষমতা অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করা হয়।
২. শিরায় তরল প্রদান: রক্তচাপ কমে গেলে এবং রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হলে উপযুক্ত স্যালাইন বা ফ্লুইড দেওয়া হয়। রোগীর হৃদযন্ত্র ও কিডনির অবস্থা বিবেচনা করে তরলের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয়।
৩. অক্সিজেন ও অঙ্গের সহায়তা: অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে অক্সিজেন দেওয়া হয়। গুরুতর শ্বাসকষ্টে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে। স্যালাইনেও রক্তচাপ না বাড়লে নর অ্যাড্রিনালিনের মতো ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।
৪. সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ: সংক্রমিত পুঁজ নিষ্কাশন, সংক্রমিত ক্যাথেটার অপসারণ অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৫. নিবিড় পর্যবেক্ষণ: সেপসিসের সংক্রমণ ও অঙ্গের বৈকল্যের লক্ষণ শনাক্ত করতে সার্বক্ষণিক শারীরিক পরীক্ষা বা মনিটরিং করতে হয়। রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ, অক্সিজেন স্যাচুরেশন, ল্যাকটেট এবং কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
সেপসিস প্রতিরোধে করণীয়
সংক্রমণ এড়িয়ে আর প্রাথমিক অবস্থায় সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমেই প্রধানত সেপসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পরে, হাঁচি-কাশির পর সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ভালোমতো হাত পরিষ্কার করুন।
শরীরের যেকোনো কাটা-ছেঁড়া বা ক্ষতস্থান পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ক্ষত পুরোপুরি না শুকানো পর্যন্ত নিয়মিত পরিষ্কার করুন ও ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধক টিকাগুলো সময়মতো নিয়ে নিন।
ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, ফুসফুসের রোগ বা ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন থেকে বিরত থাকুন এবং নির্ধারিত কোর্স নিয়ম মেনে সেবন করুন।
অতিরিক্ত কাঁপুনি, জ্বর, তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্টের মতো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইউনিকো হাসপাতাল, গ্রিনরোড, ঢাকা।
