বাংলাদেশে ৩৫ বছরের বেশি বয়সে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। আইন পেশার মান উন্নয়ন, পেশাটির মর্যাদা রক্ষা এবং বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বয়সসীমা নির্ধারণের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানালেও কেউ মনে করছেন, বয়স বেঁধে দিয়ে আইন পেশার অনিয়ম ও অসংগতি দূর করা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, বার কাউন্সিলের পরীক্ষার মান উন্নয়ন, আইনজীবীদের আচরণবিধি কার্যকর করা এবং পেশাগত দক্ষতা যাচাইয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কেন ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত?
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ৩৫ বছরের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পেশাটিকে আরও পেশাদার ও সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই এর উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, গত ১৯ আগস্ট বার কাউন্সিলের বর্তমান এডহক কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৫ সদস্যের কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তটিতে একমত হয়। এ ক্ষেত্রে লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির সুপারিশও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে আইনজীবী হওয়ার সর্বোচ্চ বয়স ৩০, ৪০ ও ৪৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব উঠেছিল। পরে ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রুহুল কুদ্দুস কাজলের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো একটি সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত আসেনি। বরং আদালত অঙ্গনের বিভিন্ন অভিযোগ, বিচার বিভাগের নির্দেশনা এবং আইন পেশার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।
ভুয়া আইনজীবী ও প্রতারণা ঠেকানোর যুক্তি
আদালত অঙ্গনে ভুয়া আইনজীবী, দালাল, প্রতারণা এবং পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বয়স বেশি হওয়ায় অনেককে সাধারণ মানুষ অভিজ্ঞ বা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলে ভুল করতে পারেন। এ সুযোগে প্রতারণার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পুরোনো রায়ে আইনজীবী হিসেবে পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছিল। সেই রায় পর্যালোচনা করেই বার কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাঁর মতে, আইন পেশার প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ানো এবং বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সিদ্ধান্তটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের কী হবে?
বাংলাদেশে অনেকেই জীবনের পরবর্তী সময়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কেউ অন্য পেশায় কাজ করার পর আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন, আবার কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ল কলেজগুলোতে দুই বছর মেয়াদি এলএলবি পাসকোর্স সম্পন্ন করে আইনজীবী হওয়ার প্রস্তুতি নেন।
দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মেয়াদি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রির সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৭৯টি কলেজে দুই বছর মেয়াদি এলএলবি পাসকোর্স পড়ানো হয়।
আইনজীবীদের একাংশের আশঙ্কা, বয়সসীমা কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিশেষ করে যাঁরা ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে আইন বিষয়ে পড়ছেন, তাঁদের পক্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিগ্রি শেষ করে বার কাউন্সিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কঠিন হতে পারে।
সেশনজট ও বার কাউন্সিল পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুই বছরের কোর্স শেষ করতে অনেক সময় প্রায় পাঁচ বছরও লেগে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত। তাঁর মতে, বয়সসীমা ৪০ বা ৪৫ বছর নির্ধারণ করা হলে তা আরও যুক্তিসংগত হতো।
অন্যদিকে, অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, বর্তমানে যাঁরা পড়াশোনা করছেন তাঁদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ কারণে ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের শর্ত বা ছাড় রাখা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
শুধু বয়সসীমা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে?
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, আইনজীবীদের সম্মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারে শুধু বয়সসীমা নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, বার কাউন্সিলকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে কার্যকর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনজীবীদের অসদাচরণ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিয়ম কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। এসব বিধান যথাযথভাবে কার্যকর না হলে বয়সসীমা কমিয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন।
একই ধরনের মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কুমার দেবুল দে। তাঁর মতে, আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা নৈতিকতার প্রশ্নকে শুধু বয়সের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। বরং বার কাউন্সিল পরীক্ষার মান নির্ধারণ, নিয়োগপ্রক্রিয়া সংশোধন, নৈতিক শিক্ষার উন্নয়ন এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আইনজীবী শারমিন শিউলি বয়সসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। পেশাটির গুণগত মান বজায় রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ল কলেজগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
বয়সসীমা কার্যকর হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ল কলেজগুলোর শিক্ষার্থীসংখ্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অমিত দাশগুপ্তের আশঙ্কা, বয়সের বিধিনিষেধের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী আইনজীবী হওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন।
তবে ল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নাকচ করেছেন ডেমরা ল কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি গাজী কামরুল ইসলাম সজল। তাঁর মতে, আগে ভর্তি হওয়া বা নিবন্ধন সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বার কাউন্সিল গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলও জানিয়েছেন, ল কলেজ বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কাউকে অযথা ক্ষতির মুখে না ফেলতে সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রয়োজনীয় শর্ত যুক্ত করার বিষয়ে কাজ চলছে।
অন্য দেশে আইনজীবী হওয়ার বয়সসীমা কত?
আইন পেশায় প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা আন্তর্জাতিকভাবে কতটা প্রচলিত, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারিত নেই।
ভারতে একসময় আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়স ৪৫ বছর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্তটি বাতিলের নির্দেশ দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে এ ধরনের সীমা পেশা পরিবর্তনকারী ও অবসরপ্রাপ্তদের প্রতি বৈষম্যমূলক হতে পারে বলে উঠে আসে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে চাকরিতে প্রবেশ বা অবসরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। আইন পেশার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ বয়স বেঁধে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সিদ্ধান্ত কার্যকরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি, পেশাগত আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। সংস্থাটির বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে আইনজীবী হিসেবে প্রথমবার তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে তালিকাভুক্তির বিষয়ে বার কাউন্সিল আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও আগে থেকে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কীভাবে সিদ্ধান্তটি প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে আরও শর্ত নির্ধারণের কাজ চলছে।
সব মিলিয়ে, আইন পেশার মান ও মর্যাদা রক্ষার যুক্তিতে ৩৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ, বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা এবং আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বার কাউন্সিলের চূড়ান্ত নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ওপর।
The post ৩৫ বছরের পর আইনজীবী হওয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত, পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি appeared first on SATV.
