শিশুর নানার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে আপসের অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগের পরও মামলা না নেওয়ার দাবি
নড়াইল প্রতিনিধি।।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় ১০ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক মুফতি শরীফ শহিদুল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং ভুক্তভোগী শিশুটির নানার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা রেকর্ড করা হয়নি। বরং প্রভাবশালী একটি মহলের চাপের মুখে শিশুটির নানাকে আপসের মুচলেকা দিতে বাধ্য হতে হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর দুপুরে কালিয়া মহিলা মাদ্রাসায় পানি আনতে বলার পর ওই ছাত্রীকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করেন শিক্ষক শরীফ শহিদুল্লাহ এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে বাড়িতে ফিরে শিশুটি তার নানাকে বিষয়টি জানায়।
শিশুটির নানা মো. ইদ্রিস শেখ (৬৩) এ ঘটনায় কালিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন বলে জানা গেছে। তবে পরিবারের দাবি, অভিযোগ দেওয়ার পরও পুলিশ মামলা রেকর্ড করেনি। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে একটি প্রভাবশালী মহল থানা পুলিশকে প্রভাবিত করে বিষয়টি আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। একপর্যায়ে শিশুটির নানার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মুচলেকায় যা লেখা রয়েছে
মুচলেকায় মো. ইদ্রিস শেখ উল্লেখ করেন, তাঁর মেয়ের ঘরের নাতনি (১০) ও কালিয়া মহিলা মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি শরীফ শহিদুল্লাহর মধ্যে ২০ অক্টোবর ঘটে যাওয়া বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের সম্মতিক্রমে আপস-মীমাংসা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ করা হবে না বলেও মুচলেকায় উল্লেখ রয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের সম্মতিক্রমে এবং কারও প্ররোচনা ছাড়া নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এ মীমাংসা করা হয়েছে।
তবে শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে এ ধরনের মুচলেকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, শিশুটির নিরাপত্তা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের পরিবর্তে আপসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা কতটা আইনসম্মত—এ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার শিক্ষকের
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক শরীফ শহিদুল্লাহ ঘটনাটি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, এটি একটি ষড়যন্ত্র। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইদ্রিস আলী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
একটি শিশুর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন মামলা রেকর্ড করা হয়নি-এ প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের পর শিশুটির পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া, শিশুটির বক্তব্য সংবেদনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে মুচলেকার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা আরও উদ্বেগজনক।
এ ঘটনায় প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও পুলিশকে প্রভাবিত করার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্যের বাইরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, মুচলেকা নেওয়ার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
