চলতি মাসে হরমুজ প্রণালী এবং এর কাছাকাছি এলাকায় বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংঘাতের মধ্যে কৌশলগত সমুদ্রপথটিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তৎপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালীতে অন্তত ১২টি জাহাজে হামলা হয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলার প্রকৃত সংখ্যা সঠিকভাবে তুলে ধরতে ইউকেএমটিও হিমশিম খাচ্ছে, কারণ আক্রান্ত জাহাজগুলোর অধিকাংশই ইউকেএমটিও-কে এ বিষয়ে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, অন্যান্য সূত্রের মাধ্যমে তারা এই জলপথে আরও কিছু ঘটনার কথা জানতে পেরেছে, কিন্তু তথ্যের অভাবে সেগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অক্টোবরের প্রথম দিকে একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর থেকে এই মাসেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত ১২টি জাহাজের মধ্যে অর্ধেকই তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে বা বন্দরে নোঙর করেছে। একটি জাহাজ ডুবে গেছে, দুটি অকেজো হয়ে পড়েছে এবং তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা সেগুলোর পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইউকেএমটিও নতুন ধরনের একটি হামলার কথা জানিয়েছে। একটি ট্যাঙ্কারের ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ জুবাইল শহর থেকে প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে একটি ছোট নৌকা থেকে রকেট-চালিত গ্রেনেড (আরপিজি) নিক্ষেপ করা হয়, যা তাদের জাহাজের পেছনের বাম দিকের অংশে আঘাত হানে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোর সাথে সমন্বিত এক বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের জলপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পরিমাণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে হামলা বেড়ে যাওয়ায় এই পরিবহনের পরিমাণে প্রতি সপ্তাহে ওঠানামা করছে।
‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত সাত দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। এটি যুদ্ধপূর্ব সময়ের প্রতিদিন ১৭.১ মিলিয়ন ব্যারেল পরিবহনের হারের প্রায় ৬৮ শতাংশ। চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে শুক্রবার অপরিশোধিত তেল ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারে পৌঁছেছে।
ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং বাব আল-মানদাব প্রণালি দখলের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরেছে।
এক ভিডিও বার্তায় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, তেহরানের হামলা সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ৪০০টি জাহাজ এবং ১০ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। তিনি বলেন, আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই হরমুজ প্রণালি ইরান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং আমাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি জাহাজগুলোর ওপর হামলার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে আইআরজিসির ‘হতাশাকে’ দায়ী করেন। মার্কিন সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, তারা একটি ‘দৃঢ়’ নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলো দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ঠেকিয়ে রেখেছে। তাদের ভাষ্যমতে, এই অবরোধের কারণে ইরান তেল রপ্তানি থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার আয় হারিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্থায়নের ৩৫০ মিলিয়ন ডলার জব্দ করেছে।
ইউকেএমটিও-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সাত দিনে ১২৫টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে বাইরে গেছে এবং ১২৯টি জাহাজ ভেতরে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল শুষ্ক বাল্ক কার্গো বহনকারী; এরপর ছিল ট্যাঙ্কার পণ্য ও সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ।
তেহরান ঠিক কতগুলো জাহাজে হামলা হয়েছে বা কতগুলো জাহাজ কৌশলগত এই সমদ্রপথ দিয়ে চলাচল করছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি। তবে তাদের অভিযোগ, ওয়াশিংটন নিজেদের নৌ-অভিযানের সাফল্য জাহির করার জন্য এই সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে খবর পাওয়া গেছে, চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজ নৌ-মাইন বা সমুদ্রতলে পেতে রাখা মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরবিরোধী দাবি করেছে।
আইআরজিসি দাবি করছে, কৌশলগত এই জলপথে জাহাজগুলো মাইন বা বিস্ফোরকের কবলে পড়ছে। তাদের মতে, যেসব জাহাজ ইরানের ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’-র সঙ্গে সমন্বয় করছে না, তাদের জন্য এই জলপথ অনিরাপদ। সর্বশেষ আইআরজিসি জানিয়েছে, দুই মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেলবাহী একটি সুপারট্যাঙ্কার একটি ‘অননুমোদিত’ পথে যাওয়ার সময় মাইন বিস্ফোরণের কবলে পড়ে আগুন ধরে যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘প্রেস টিভি’ কিছু ফুটেজ প্রকাশ করেছে, যেখানে ট্যাঙ্কারটিতে আগুন জ্বলতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সেন্টকম জানিয়েছে, তারা ওই জলপথ থেকে নৌ-মাইন অপসারণ করেছে এবং জাহাজগুলো আসলে বিভিন্ন প্রজেক্টাইলের (ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল জাতীয় বস্তু) আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
