পঞ্জিকা মেনে মা দুর্গার এবার ঘোটকে আগমন হলেও ভক্তদের পুজো নিতে কখনও তাঁকে পাড়ি দিতে হয় সড়কপথে, কখনও ট্রেনের পার্সেল ভ্যানে দেশের নানা শহরে, এমনকী বিমানে চেপে বিদেশেও। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের হাত ধরে দেবীর এই যাত্রার কাহিনি যেন বাঙালির পুজো ও ভ্রমণের এক মেলবন্ধন। লিখছেন সমীর গোস্বামী।
দুর্গাপুজোর দিন কয়েক আগে থেকেই বাঙালির বেড়াতে যাওয়ার ঢল নেমে যায়। চলে প্রায় দীপাবলি পর্যন্ত। পুজোর সময়– ভারতের যেখানে যাবেন– পাহাড়, সমুদ্র, মরুভূমি, বড় শহর– সর্বত্রই বাঙালি ভ্রমণার্থীদের থিকথিকে ভিড়। এর জন্য পর্যটকদের অনেক ক্ষেত্রে পরিবহণ পাল্টে পাল্টে নিতে হয়। মা দুর্গাকেও পুজোয় বাপের বাড়ি এসে তাই-ই করতে হয়।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, মা দুর্গা এ বছর কৈলাস থেকে আসছেন ঘোটকে, অর্থাৎ ঘোড়ায়। তারপরে কিন্তু পুজোর জন্য বিভিন্ন শহরে পুজোর নিমন্ত্রণ অনুযায়ী, যান পাল্টে পাল্টে তঁাকে যেতে হবে।
২০২৫ সালে হাওড়া থেকে ট্রেন-যোগে দুর্গাপ্রতিমা বিভিন্ন স্টেশনে গিয়েছিল মোট ৭৫৯টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গিয়েছিল জব্বলপুরে– ২৮৮টি। সাতনায় গিয়েছিল ৯০টি, বিলাসপুরে ১১২টি, কাটনি জংশন ও নাগপুর– দুই জায়গাতেই গিয়েছিল ৪৭টি করে। সেকেন্দ্রেবাদে পাঠানো হয় ২৫টি প্রতিমা। লখনউ ও বারাণসীতে যথাক্রমে ৩০ ও ১৮টি। এছাড়াও চেন্নাই, পুদুচেরি, সম্বলপুর, ভদোদরা ইত্যাদি মোট ১৭টি স্টেশনে হাওড়া থেকে গত বছর বিভিন্ন দূরপাল্লার মেল এক্সপ্রেস ট্রেনের পার্সেল ভ্যানে পাঠানো হয়েছিল। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ১টি মাত্র প্রতিমা জম্মু-তাওয়াই গিয়েছিল গত বছরে।
যাত্রীদের যেমন ট্রেনে চেপে দূরে গেলে ‘রিজারভেশন’ করতে হয়, প্রতিমা নিয়ে যেতে হলেও ঠিক তেমনই নিয়ম মেনে পার্সেল ভ্যানে ‘বুক’ করতে হয়। সব প্রতিমা যে একই দিনে একই ট্রেনে নিয়ে যাওয়া যাবে– এমন কথা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। পার্সেল ভ্যানে স্থান সংকুলানের ব্যাপার আছে। সেক্ষেত্রে অন্য ট্রেনে বা অন্য দিনে নিয়ে যেতে হবে। পার্সেল ভ্যানে নিয়ে গেলে, ট্রেন বা দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া দিতে হয়। দ্রুতগামী ট্রেনের ‘বুকিং চার্জ’ স্বভাবতই বেশি।
বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ১৭৫টি ঠাকুর প্রতি বছর বিদেশের বিভিন্ন শহরে যায়।
এ বছরও পার্সেল ভ্যানে দুর্গাপ্রতিমা নিয়ে যাওয়া ব্যাপক হারে চলছে। হাওড়ায় রেলের পার্সেল দফতরের কর্মীদের ঠাকুর ‘বুকিং’ করে বিভিন্ন স্টেশনে পাঠানোর কাজে নাকানিচোবানি খাওয়ার অবস্থা। এমনিতেই পুজোয় বিভিন্ন জিনিস পার্সেল ভ্যানে পাঠানোর জন্য অত্যধিক চাপ থাকে। লোকাল ট্রেনেও শহরতলিতে ঠাকুর নিয়ে যাওয়া হয় ভেন্ডর কামরায়। তবে এর জন্য কোনও ‘বুকিং চার্জ’ লাগে না। দুর্গাপ্রতিমা কিন্তু কলকাতার কুমোরটুলি থেকে বিমান বা জাহাজ-যোগে বিদেশেও যায়। কথা হচ্ছিল কুমোরটুলির মৃৎশিল্পী মিন্টু পালের সঙ্গে। ওঁর সঙ্গে কথা বলেই বিদেশে ঠাকুর পাঠানোর ব্যাপারে বিস্তারিত জানা গেল।
মিন্টুবাবু জানালেন, বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ১৭৫টি ঠাকুর প্রতি বছর বিদেশের বিভিন্ন শহরে যায়। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের মধ্যে অনেকেই ‘অর্ডার’ মাফিক বিদেশের ঠাকুর ‘সেরে’ ফেলেছেন। মালবাহী বিমানে ঠাকুর পাঠানো হলেও সাইজে ছোট হয়। চালচিত্র নিয়ে বড়জোর ৪ ফুট মতো উচ্চতার হয়। কালী ঠাকুরও কলকাতা থেকে বিদেশে যায়। মিন্টুবাবু এ বছর ২০টি দুর্গা ঠাকুর ও ৬টি কালী ঠাকুর বিদেশের জন্য অর্ডার পেয়েছেন।
এ বছরের জুলাই মাস থেকে ঠাকুর বিদেশে যেতে শুরু করেছে। কোন কোন দেশে সাধারণত ঠাকুর নিয়ে যাওয়া হয়, প্রশ্ন করাতে, মিন্টুবাবু বললেন, ‘কত দেশের নাম বলব? তবে সবচেয়ে বেশি যায় আমেরিকায়।’ এ বছরই আমেরিকার শিকাগো, সিটাডেল ফ্লোরিডা, টেক্সাসে ঠাকুর গিয়েছে। আগস্ট মাসে দুবাইতে পাঠিয়েছেন। এছাড়া জার্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, উগান্ডা, সিঙ্গাপুর থেকেও বিভিন্ন মৃৎশিল্পীদের কাছে ‘অর্ডার’ ছিল।
দেবী দুর্গা এখানে আসেন, হয় ভক্তদের বাড়ি পুজো নিতে, অথবা কোনও মন্দিরে না হলে প্যান্ডেলে। অর্থাৎ আমরা বেড়াতে গেলে যেমন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে উঠি।
বিদেশের এক-একটা শহর থেকে একাধিক পুজোর অর্ডারও আসে। তবে বিদেশে প্রতি বছর ঠাকুর বিসর্জন দেওয়ার রীতি নেই। নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা এড়াতে, ওখানকার পুজোর আয়োজকরা ২-৩ বছর প্রতিমা রেখে দেন। প্রশ্ন করলাম, ঠাকুর নিয়ে যাওয়ার সময় ভেঙে যায় না?
–কেন ভেঙে যাবে? আগে ফাইবার গ্লাস দিয়ে প্যাকিং করে তারপরে কাঠের বাক্সে ভরে পাঠানো হয়। তবে অস্ত্রশস্ত্রগুলো লাগানো থাকে না। ওখানে গিয়ে লাগানো হয়।
জানালেন, বেশ কয়েক বছর আগে এখানকার কোনও এক মৃৎশিল্পীকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে ঠাকুর বানানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু প্লেনভাড়া, অন্যান্য গাড়িভাড়া, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা অত্যধিক ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। সেজন্য ওখানকার বাসিন্দারা এখান থেকেই নিয়ে যাচ্ছেন। এ বছর কুমোরটুলির একজন মৃৎশিল্পীকে শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
দেবী দুর্গা এখানে আসেন, হয় ভক্তদের বাড়ি পুজো নিতে, অথবা কোনও মন্দিরে না হলে প্যান্ডেলে। অর্থাৎ আমরা বেড়াতে গেলে যেমন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে উঠি। অথবা হোম-স্টে বা গেস্ট হাউসে, নাহলে যেমন অ্যাডভেঞ্চারের জন্য টেন্টে থাকি– সেইরকম আর কী!
(মতামত নিজস্ব)
লেখক ভূতপূর্ব মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক, ভারতীয় রেল
[email protected]
