প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কি দেননি, তা বিবেচনায় না নিয়ে সব নাগরিকের সেবা করার পাশাপাশি সব অঞ্চলে সমানভাবে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায় সরকার। তিনি বলেন, দেশের মানুষ বর্তমান সরকারকে নির্বাচিত করেছে। কোনো কোনো এলাকায় বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন, আবার কোনো এলাকায় হননি। কিন্তু বর্তমান সরকার দেশের সব মানুষের সরকার হতে চায়। যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের সরকার হতে চায়, তেমনি যারা ভোট দেননি, তাদেরও সরকার হতে চায়।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে রংপুরের ঐতিহাসিক রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ও বিভিন্ন অঞ্চলে ন্যায্যভাবে সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে সরকার সারা দেশে সমানভাবে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়। তিনি জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় রংপুর মহানগরের উন্নয়নে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জেলা পরিষদের মাধ্যমে রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে সেতু, কালভার্ট, স্কুল, কলেজসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে ও পারস্পরিক বিভেদ ভুলে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।’
তবে সবাইকে নিয়ে ঐক্য গড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজ আমি সবার কাছে, বিশেষ করে যারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে, তাদের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই। অতীতে আমরা দেখেছি, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার ফলাফলটা খুব শুভ হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ সেই উদ্দেশ্যকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।’
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য একসঙ্গে লড়াই করেছেন। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও বিভিন্ন ধর্মের ও পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারী সরকারকে সরিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
গণঅভ্যুত্থানকে হেয় না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কারও ভিন্নমত থাকলে তা সংসদে তুলে ধরতে হবে। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আলোচনা করে জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, আগামী হাজার বছরও এ দেশের মানুষ এভাবেই শান্তিতে একসঙ্গে বসবাস করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশটি হাজার বছর ধরে সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। শান্তিতে আমরা সবাই মিলে বসবাস করছি। আমরা চাই, আগামী হাজার বছরও যেন আমরা একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।’
শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বিভেদ ভুলে সবাইকে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার কাজে একসঙ্গে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘অতীতে আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, সন্তানদের পড়াশোনা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়েছে। আমরা আর এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাই না। জনগণ এখন দেশে স্থিতিশীলতা চায়। তারা শান্তিতে ও নিরাপদে থাকতে চায়। বর্তমান সরকার সেটিই নিশ্চিত করতে কাজ করছে।’
তারেক রহমান বলেন, এই দেশ আমাদের সবার। দেশ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিভ্রান্তি ও বিভেদ পেছনে ফেলে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতীতে আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখেছি, তা পরিবর্তন করতে চাই। সরকার সেই পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। তবে এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণ। অতীতের মতো এবারও আমরা চাই, মানুষ বর্তমান সরকারের পাশে থাকুক।’
এ সময় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে মন্দিরে পৌঁছালে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হয়। শিশুরাও নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানায়।
তারেক রহমান মন্দিরের পুরোহিত ও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারসহ রাজনৈতিক নেতা ও সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ অন্যরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রংপুরে এটিই ছিল তারেক রহমানের প্রথম সফর।
