মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ ও সচল একটি অঙ্গ কাঁধ। এটি প্রধানত তিন ধরনের হাড় নিয়ে গঠিত। এগুলো হলো- ক্লাভিকল বা কলার বোন, স্ক্যাপুলা বা কাঁধের ফলক এবং হিউমেরাস বা বাহুর উপরিভাগের হাড়। কোনো দুর্ঘটনা, সরাসরি আঘাত, খেলাধুলার সময় চোট কিংবা অস্টিওপোরোসিসের দরুন হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে কাঁধের ফ্র্যাকচার বা হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। বয়স্ক পুরুষ ও নারী এবং বিশেষ করে মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তি-পরবর্তী নারীর হাড়ের ঘনত্ব কমে অস্টিওপোরোসিস হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। কাঁধে ফ্র্যাকচার হলে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র ব্যথা, ফোলাভাব, নীলচে দাগ পড়া, হাত সরাতে না পারা বা কাঁধের স্বাভাবিক আকৃতিতে বিকৃতি দেখা দেওয়ার মতো লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায়। অনেক সময় হাত নাড়ানোর চেষ্টা করলে হাড়ের ঘর্ষণের অদ্ভুত শব্দ অনুভূত হতে পারে। কোনো ব্যক্তির কাঁধে চোটের পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসক প্রথমত রোগীর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং ফ্র্যাকচারের সুনির্দিষ্ট স্থান ও মাত্রা চিহ্নিত করতে প্রধানত এক্স-রে করে থাকেন। তবে হাড়ের জটিল বা সূক্ষ্ম ভাঙন, চারপাশের নরম টিস্যু অথবা স্নায়ুর ক্ষয়ক্ষতি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করার জন্য প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান কিংবা এমআরআই পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। একই সাথে রোগীর হাড়ের সামগ্রিক ক্ষয়ের পরিমাণ নির্ণয়ে ডেক্সা (উঊঢঅ) স্ক্যানের সাহায্য নেওয়া হতে পারে। রোগ নির্ণয়ের পর ভাঙার ধরন ও গভীরতার ওপর ভিত্তি করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
যদি হাড় সরে না যায় বা সামান্য ফাটল থাকে, তবে অস্ত্রোপচার না করেই এর চিকিৎসা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে হাত নির্দিষ্ট পজিশনে রাখার জন্য সিøং বা ব্রেস ব্যবহার করা হয়, সঙ্গে ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়। তবে হাড় অতিরিক্ত সরে গেলে বা টুকরো হয়ে গেলে তা পুনর্গঠনে প্লেট, স্ক্রু বা রড বসানোর জন্য সার্জারির প্রয়োজন পড়ে। পাশাপাশি অস্টিওপোরোসিসের সমস্যা থাকলে হাড়ের ক্ষয়রোধ ও ঘনত্ব বাড়াতে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট এবং চিকিৎসকের নির্দেশনানুসারে বিসফসফোনেট, অ্যালেনড্রোনিক অ্যাসিড, ইবানড্রোনিক অ্যাসিড কিংবা বিশেষ বায়োলজিক্যাল থেরাপি হিসেবে ডেনোসুমাব সেবন করতে হয়।
হাড়ের পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করতে এবং পুনরায় কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ও চিকিৎসকের নির্দেশিত ওজন বহনকারী ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সঠিক সময়ে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার মাধ্যমে কাঁধের স্বাভাবিক সচলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক : অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন
সার্জারি বিভাগ, নিটোর এবং
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড
হাসপাতাল লিমিটেড পিএলসি, ঢাকা
