৫৮ সেকেন্ড আগে
![]()
তাসনিম মহসিন
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের পতাকা | ছবি: সংগৃহীত
বিস্তারিত তথ্য না জানিয়ে সৌদি আরবে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক যোগাযোগের বড় ধরনের ঘাটতি সামনে এসেছে।
এদিকে, দেশটিতে দণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত আরও ২০ বাংলাদেশির পরিণতি নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কাছে সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো কারাবন্দি বাংলাদেশিদের একটি তালিকায় দুজনের নাম ছিল।
তবে, সেই তালিকায় তাদের মামলার রায় বা সাজার বিষয়টি উল্লেখ ছিল না।
এ ঘটনা প্রবাসীকর্মীদের বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশের মিশনগুলো পর্যাপ্ত তথ্য পাচ্ছে কি না এবং তারা কতটা কার্যকরভাবে কনস্যুলার সেবা দিতে পারছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেদ্দা কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সেপ্টেম্বরে সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি কারাবন্দি ও আটকের একটি তালিকা দেয়।
‘বশির ও সুইটির ঘটনার পর আমরা তালিকাটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করি। সেখানে আরও ২০ জনের নাম পেয়েছি, যাদের নামের পাশে “দণ্ডপ্রাপ্ত” লেখা থাকলেও সাজার বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না,’ বলেন তিনি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখের মতো বিশাল সংখ্যক বাংলাদেশি থাকেন। এ কারণে বাংলাদেশি বন্দির সংখ্যাও বেশি। তাই, কনস্যুলার সেবা দিতে গেলে দণ্ডের ধরনের ওপর ভিত্তি করে অগ্রাধিকার তৈরি করতে হয়।’
সূত্র জানায়, গত ২০ অক্টোবর কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে জেদ্দায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা আঞ্চলিক শাখায় একটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুজনসহ ২২ বাংলাদেশির মামলার রায় ও দণ্ডের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, বন্দি হিসেবে তাদের 'দণ্ডপ্রাপ্ত' হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও রায়ের সার-সংক্ষেপের ঘর খালি রাখা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবার জন্য রায়ের বিস্তারিত সার-সংক্ষেপ জানা অত্যন্ত জরুরি।
সৌদির তালিকা অনুযায়ী, এই ২২ জনের মধ্যে আটজন হত্যা মামলায়, পাঁচজন মাদকপাচার মামলায় ও পাঁচজন ব্যক্তিগত অধিকার বা পাওনা সংক্রান্ত মামলায় বিচারাধীন বা দণ্ডপ্রাপ্ত। দুজন রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে, একজন সাইবার অপরাধে ও একজন ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত।
তাদের মধ্যে ছয়জন জেদ্দার জাব্বান কারাগারে, ছয়জন শুমাইসিতে ও চারজন জেদ্দা জেনারেল প্রিজনে বন্দি।
বাকি ছয়জন নাজরান, খামিস, আল-বাহা, হাদ্দা ও জেদ্দার নারী কারাগারে বন্দি।
দায়বদ্ধতা ও প্রতিকার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান ডেইলি স্টারকে বলেন, কোনো দেশে বিদেশি নাগরিক আটক থাকলে বা মারা গেলে কনস্যুলার যোগাযোগ ও বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতাগুলো ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস’-এর ৩৬ ও ৩৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত রয়েছে।
‘আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর যোগাযোগের এমন ঘাটতি থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক,’ বলেন তিনি।
অধ্যাপক শাহাব এনাম আরও বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশই যে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স থেকে উপকৃত হচ্ছে তা নয়, সৌদি আরবও সমানভাবে উপকৃত হচ্ছে। তাদের দেশের চরম আবহাওয়া ও কঠিন পরিবেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসীরা সবচেয়ে কষ্টকর কাজগুলো করছেন।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে ঔপনিবেশিক আমলের অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদায়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সৌদিতে আমাদের নাগরিকদের কল্যাণে আমরা যদি সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই, তবে স্থানীয় ও শ্রম আইন, সালিশি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনি বিষয়ে অভিজ্ঞ “আইনজীবী কনসাল” পদ তৈরি করা উচিত।’
‘একইসঙ্গে সৌদি আরবে আমাদের নাগরিকদের সহায়তার জন্য একটি আইনি অর্থায়ন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন,’ বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, স্থানীয় ভাষায় পারদর্শী না হলে আটক ব্যক্তিরা বেশি বিপদে পড়ে যান। কারণ আইনি প্রক্রিয়া বুঝে আত্মপক্ষ সমর্থন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আইনি কৌশল নেওয়া গেলে যোগাযোগের এই ঘাটতিগুলো দূর করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
মুক্তি ও ক্ষমা আবেদন
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এসব ঘটনা যেভাবে সামলানো হয়েছে তা নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছে কনস্যুলেট।
একইদিনে পাঠানো পৃথক একটি চিঠিতে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে পাঁচ ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশি কারাবন্দি ও আটকদের মুক্তি, ফেরত পাঠানো বা ক্ষমা করা এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে বিবেচনা করতে সৌদি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়।
যাদের সাজা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কনস্যুলেট দ্রুত মুক্তি ও দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানায়।
যারা সাজার একটি অংশ পার করেছেন এবং কারাগারে ভালো আচরণ বজায় রেখেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্ষমা, মুক্তি ও দেশে ফেরত পাঠানোর আবেদন করা হয়েছে।
প্রথমবার আটক ও লঘু অপরাধে আটক যাদের সাজার একটি অংশ শেষ হয়েছে , তাদের বাকি সাজা সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আর যাদের মামলা এখনো বিচারাধীন, তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া যেন দ্রুত হয় সেই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
১৬ বছরে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
ইউরোপভিত্তিক 'ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস'-এর ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদিতে অন্তত ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
নথিপত্র থেকে এসব ঘটনার তথ্য তুলে ধরা ওই প্রতিবেদনের নাম ছিল 'ব্ল্যাডশেড অ্যান্ড লাইস: মোহাম্মদ বিন সালমানস কিংডম অব এক্সিকিউশনস'।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে আরও অন্তত এক বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য আছে।
গত ১৪ অক্টোবরের দুটি মৃত্যুদণ্ডসহ এই সংখ্যা এখন অন্তত ১৯ জনে পৌঁছেছে।
ইউরোপের ওই সংস্থাটি জানায়, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরব এক হাজার ২৪৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, যার মধ্যে ৪৯০ জনই বিদেশি নাগরিক।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন পাকিস্তানি ১৬৪ জন। এরপর ইয়েমেনি ৯২ জন, সিরিয়ান ৫৮ জন, মিশরীয় ২৬ জন, জর্ডানের ২৫ জন, নাইজেরীয় ১৭ জন, ইথিওপীয় ১৫ জন ও চাদের নাগরিক ১৪ জন।
