কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কৃষকের অবদান অপরিসীম।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কৃষকের অবদান অপরিসীম। অথচ কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি কৃষককে ভোগান্তির শিকার হতে হয়, তাহলে তা শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও অশনিসংকেত। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বিভিন্ন জেলায় সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে। ডিলারশিপ থেকে বঞ্চিত আবেদনকারীরা এ অভিযোগ তুলেছেন। এছাড়া সার ডিলার নিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন মহল থেকে। উঠেছে চরম দলীয়করণের অভিযোগও। কৃষকের কাছে সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেলে পুরো বিতরণব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সার কৃষি উৎপাদনের অন্যতম অপরিহার্য উপকরণ। জমির উর্বরতা, ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করতে সুষম সার প্রয়োগের বিকল্প নেই। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, শাকসবজি কিংবা অন্যান্য অর্থকরী ফসল—সব ক্ষেত্রেই সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পাওয়া জরুরি। বিশেষ করে বোরো ও আমন মৌসুমে সারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষককে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। তাই সার বিতরণব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।
সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগের মূল উদ্বেগ হলো, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা ও কৃষিসেবার মানসিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় যদি নিয়োগের প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তাহলে কৃষকের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ডিলার নিয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কৃষকের দোরগোড়ায় ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া। সেখানে রাজনৈতিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেয়া হলে দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হতে পারেন।
আমরা মনে করি দলীয়করণের এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। কোন এলাকায় কী প্রক্রিয়ায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, আবেদনকারীদের যোগ্যতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে যোগ্য ও সৎ আবেদনকারীদের ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকরা যদি প্রয়োজনের সময় সার না পান, তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফসলের ফলন কমে গেলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সার বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু কৃষকের সমস্যা নয়; এর প্রভাব বিস্তৃত হবে ভোক্তা, ব্যবসায়ী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সার সংকটের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি, মজুতদারি, কালোবাজারি কিংবা প্রভাবশালীদের কাছে সার সরিয়ে দেওয়ার মতো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করতে হবে।
আমরা মনে এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিলার নিয়োগে সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ডিলারদের কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ডিলার নিয়োগ দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না; কৃষক প্রকৃতপক্ষে সার পাচ্ছেন কি না, সেটিই হতে হবে সাফল্য পরিমাপের প্রধান মানদণ্ড।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো মানে শুধু একটি কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের খাদ্য উৎপাদন, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং কোটি মানুষের জীবনযাত্রা। আমরা মনে করি সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং সার বিতরণে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক যেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা অনিয়মের কারণে প্রয়োজনীয় সার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অঙ্গীকার। সার ডিলার নিয়োগে তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
