বয়স মাত্র আট বছর। এই বয়সে শিশুদের চোখে থাকার কথা দুষ্টুমির ঝিলিক, হাতে থাকার কথা খেলনা, আর মাথায় শোভা পাওয়ার কথা রঙিন ফিতা। অথচ জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের মোবাশিরা মোসতারিনের শৈশব যেন অন্য এক বাস্তবতায় আটকে গেছে। তার শরীরে দেখা দিয়েছে নানা অস্বাভাবিক পরিবর্তন। ছোট এই মেয়েটির জীবন প্রতিদিনই কাটছে শারীরিক কষ্ট আর সামাজিক অবহেলার সঙ্গে লড়াই করে।
মোবাশিরার মাথায় চুল নেই, নেই ভ্রু কিংবা চোখের পাপড়ি। কুঁচকে যাওয়া ত্বকের নিচে স্পষ্ট শিরা-উপশিরা। মুখের তুলনায় মাথা কিছুটা বড়। হাত-পায়ের গিঁট ফুলে আছে, পেটও কিছুটা ফোলা। নাকের গঠনেও রয়েছে অস্বাভাবিকতা। শরীরের এসব পরিবর্তন তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। কিন্তু তার মনের ইচ্ছাগুলো এখনো আর দশটি আট বছরের শিশুর মতোই।
দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার বড়বাড়ি এলাকার অটোরিকশাচালক মাহবুবর রহমান ও কোহিনূর বেগম দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে মোবাশিরা দ্বিতীয়। জন্মের সময় অন্য শিশুদের মতোই স্বাভাবিক ছিল সে। কিন্তু ২০ দিন বয়সের পর থেকেই তার মুখে ঘা, শরীরে লালচে দাগসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার শরীর ও চেহারা। একসময় শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় অসুস্থতা আর নানা সীমাবদ্ধতা।
মোবাশিরার বাবা মাহবুবর রহমান বলেন, “মেয়েটার কষ্ট আমরা চোখের সামনে দেখি। চিকিৎসার জন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করছি। লম্বা সময় ধরে চিকিৎসার খরচ আমাদের পক্ষে বহন করা কঠিন। সবাই সহযোগিতা করলে মেয়েটার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারব। ডাক্তারেরা বলেছে প্রজেরিয়া রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশ এইটার চিকিৎসা নেই।”
মোবাশিরার কষ্ট শুধু শারীরিক সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, যখন অন্য শিশুরা তাকে এড়িয়ে চলে। সমবয়সীরা যখন একসঙ্গে খেলাধুলা করে, আনন্দে মেতে ওঠে, তখন অনেকটা দূর থেকেই তাদের দেখে মোবাশিরা। অন্য শিশুদের মাথায় যখন রঙিন ফিতা দোলে, তখন তার মাথা ঢেকে থাকে গামছায়। তারও ইচ্ছে হয় অন্য শিশুদের মতো সাজতে, খেলতে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে। তার ছোট মনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একদিন নিজের মাথায় একটি গোলাপি ফিতা বাঁধবে।
মেয়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মা কোহিনূর বেগম। তিনি বলেন, “মোবাশিরার বয়স মাত্র আট। কিন্তু তাকে দেখে অনেকে ভয় পায়। সমবয়সী শিশুরাও তার সঙ্গে খেলতে চায় না। তখন মেয়েটা খুব কষ্ট পায়। ওর কষ্ট দেখে আমরা মা-বাবাও কাঁদি।”
তিনি জানান, মেয়েকে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছে। এখনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান মেলেনি। তার প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ও নিয়মিত বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান। তবে সীমিত আয়ের এই পরিবারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তার পাশাপাশি তাকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় মা-বাবাকে।
মোবাশিরার বাবা মাহবুবর রহমান বলেন, “মেয়েটার কষ্ট আমরা চোখের সামনে দেখি। চিকিৎসার জন্য যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করছি। লম্বা সময় ধরে চিকিৎসার খরচ আমাদের পক্ষে বহন করা কঠিন। সবাই সহযোগিতা করলে মেয়েটার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারব। ডাক্তারেরা বলেছে প্রজেরিয়া রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশ এইটার চিকিৎসা নেই।”
জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, প্রজেরিয়া একটি বিরল জিনগত রোগ। এ রোগে শিশুদের শরীরে দ্রুত বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দেয়। এর সম্পূর্ণ নিরাময় না থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুবই কম।
চিকিৎসকদের মতে,'প্রজেরিয়া একটি অত্যন্ত বিরল জিনগত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের শরীরে অল্প বয়সেই বার্ধক্যের মতো কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। রোগটির চিকিৎসায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য জটিলতা পর্যবেক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গোলাপি ফিতা হয়তো কারো কাছে সামান্য সাজসজ্জার উপকরণ। কিন্তু মোবাশিরার কাছে তা শৈশবের আনন্দ, নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা আর অন্য শিশুদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার প্রতীক। সেই ছোট স্বপ্ন পূরণের আশায় চিকিৎসা, সহযোগিতা ও মানুষের সহমর্মিতার অপেক্ষায় রয়েছে মোবাশিরা ও তার পরিবার।
জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “প্রজেরিয়া একটি বিরল জিনগত রোগ। এ রোগে শিশুদের শরীরে দ্রুত বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দেয়। এর সম্পূর্ণ নিরাময় না থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুবই কম। এসব শিশুর প্রয়োজন বিশেষ যত্ন, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা।”
