মুসলমানরা ইবাদত করেন মসজিদে আর হিন্দুরা প্রার্থনা করেন মন্দিরে। দুই ধর্মের মানুষের পৃথক উপাসনালয় থাকলেও টাঙ্গাইলের নাগরপুরে প্রায় ৬০ বছর যাবত চলছে নামাজ ও মণ্ডপে প্রার্থনা। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে পূজার ঘণ্টা ও ঢাকের শব্দ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ি এলাকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় উঝা ঠাকুর কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে এখানে চৌধুরী বাড়ি ক্লাব স্থাপিত হয়। ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছরই ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হয় দুর্গাপূজা। মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রায় ৪০ বছর পর ১৯৭২ সালে একই আঙিনায় নির্মাণ করা হয় নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। একই স্থানে মসজিদ আর মন্দির নিয়ে কখনও দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে আপত্তি ওঠেনি। এলাকার মানুষ মিলেমিশে নিজেদের ধর্ম পালন করছেন।
স্থানীয়রা জানান, মসজিদে আজানের সময় হলেই মন্দিরে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য কাউকে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না। দুর্গাপূজায় ঢাকের আওয়াজ, আলোকসজ্জা আর ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির। স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের আনন্দকে স্বাগত জানান।
গণেশ চন্দ্র রায় নামের এক ব্যক্তি জানান, মসজিদে আজানের পর মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। এ সময় দেবী দুর্গার পূজার সব আয়োজন বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের উৎসব পালন করেন। অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের ধর্মীয় কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করেন না।
চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। অন্যদিকে স্থানীয় মুসলমানরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। এ নিয়ে কখনো কাউকে কিছু বলতে হয়নি। একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।
পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝুনট কুমার সাহা জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালনে যাতে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে স্থানীয় মুসলমানেরা খেয়াল রাখেন। এই সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক- এমনটাই প্রত্যাশা তার।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক জানান, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। চৌধুরী বাড়ি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। মুসলমানেরা নামাজ আদায় করেন, আর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদযাপন করেন। বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপিত হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। জেলায় ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পূজা উদযাপিত হচ্ছে। দুর্গাপূজা ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এই দৃষ্টান্ত এলাকায় তৈরি করেছে এক অনন্য পরিবেশ।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, এ দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই, আমরা সবাই এ দেশের মানুষ। যার যার ধর্ম, সে সে পালন করবে। একই আঙিনায় পূজামণ্ডপে পূজা উদযাপন ও নামাজ আদায় করা হয়, এতে সমস্যা হয় না। আমরা সবাই মিলেমিশে, সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করছি।