একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানুষের কর্মদক্ষতা, শিক্ষার গুণগত মান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। এই শর্তগুলো নিশ্চিত করতে না পারলে একটি দেশের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। আর দেশে স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চান না। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। ফলে কর্মহীন জনসংখ্যা একসময় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘদিন বেকারত্ব ও হতাশার মধ্যে থাকা মানুষের একটি অংশ জঙ্গিবাদ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাই দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং বেকার তৈরি করা শিক্ষার পরিবর্তে কর্মমুখী ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রথম শর্ত নিরাপত্তা। নাগরিকের জানমাল, ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পদ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারে না।
যে সমাজে চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করে, সেখানে সাধারণ মানুষ যেমন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তেমনি উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয় এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন বলতে কেবল অপরাধ দমন কিংবা অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাকে বোঝায় না। এর মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক জাতি ধর্ম সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে আইনের কাছে সমান মর্যাদা পাবেন এবং অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা সামাজিক প্রভাব বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবে না। এমন নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার ও আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার না হন, সেদিকেও রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি চাঁদাবাজির ভয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারেন কিংবা একজন শিল্প মালিক যদি তাঁর বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তাহলে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে কীভাবে? বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগের আগে একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বিবেচনা করেন। সুতরাং আইনের শাসন কেবল সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
তবে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো, প্রশাসনিক জবাবদিহি বৃদ্ধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশও সৃষ্টি হবে। আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার পর দেশের উন্নয়নের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা। বিশেষ করে কর্মমুখী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ছাড়া বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কাল্পনিক। শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করলেই চলবে না; সেই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, উৎপাদনক্ষম ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের চাহিদার কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্জিত শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। একইসাথে বিপুল সংখ্যক যুবক এমন শিক্ষা নিচ্ছে যা দেশে বিদেশে কোথাও চাকরির সুযোগই নেই। অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্প ও উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ একদিকে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর সংকট রয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। বিজ্ঞান, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, কৃষিপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্কতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও ব্যাবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, অটোমেশন, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার ধরন বদলে দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে না পারলে আগামী দিনের কর্মবাজারে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়বে। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষাকে কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্যোক্তা কিংবা উৎপাদনমুখী কর্মী কোনোভাবেই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ নন। বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তাঁদের অবদান অপরিসীম।
শিক্ষার উদ্দেশ্য এমন হওয়া উচিত, যাতে একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে না উঠে নিজেও নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন নীতিমালা পরিবর্তন করে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করা প্রয়োজন। কর্মবাজারের চাহিদা নিরূপণ করে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
আইনের শাসন ও দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করার পর প্রয়োজন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ। বিনিয়োগ ছাড়া নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে না, উৎপাদন বাড়ে না এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি, জ¦ালানি সরবরাহ এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া জরুরি।
বেকারত্বের সামাজিক প্রভাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একজন তরুণ দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষ করে যখন কর্মসংস্থানের সুযোগ পান না, তখন তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্নের পাশাপাশি পরিবারের প্রত্যাশাও বাধাগ্রস্ত হয়। দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব থেকে হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হতে পারে। এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্র ও উগ্রবাদী সংগঠন কোনো কোনো তরুণকে বিপথগামী করার চেষ্টা করে। এতে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু শাস্তির ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়; অপরাধের অনুকূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দূর করাও প্রয়োজন। তরুণদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও স্থানীয় সম্পদনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার সম্প্রসারণ জরুরি।
বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের জন্য এক অসাধারণ সম্ভাবনা। এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে তারাই হতে পারে জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু পরিকল্পনাহীন শিক্ষা, বিনিয়োগের সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সম্ভাবনাই একসময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও নাগরিক নিরাপত্তা। এরপর প্রয়োজন কর্মমুখী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং সেই জনশক্তির জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই তিনটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক। আইনের শাসন বিনিয়োগের নিরাপত্তা দেয়, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে এবং বিনিয়োগ সেই জনশক্তির কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত করে।
মনে রাখতে হবে, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষকে কর্মহীন রেখে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় না। তাই নিরাপদ রাষ্ট্র, বিজ্ঞানমনস্ক জাতি ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই হোক আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, সেওজগাতি আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, মাগুরা।
খুলনা গেজেট/এনএম
