ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো ফলাফলই চূড়ান্ত নয় - আর রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষেত্রে এই কথার যেন আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। ম্যাচের শেষ মুহূর্তেও ঘুরে দাঁড়ানোর অসংখ্য নজির গড়েছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ৩-১ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ সাত মিনিটে তিন গোল করে জয় ছিনিয়ে নিল রিয়াল মাদ্রিদ। আর তাতেই মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের উৎসব বদলে গেল হতাশায়।
১৫ অক্টোবর (বুধবার) রোমের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় রোমা ও রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের তখন ৮২ মিনিট। স্কোরবোর্ডে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে রোমা, গ্যালারিজুড়ে জয়ের উল্লাস। সমর্থকদের চোখেমুখে স্বস্তি, অপেক্ষা শুধু শেষ বাঁশির। কিন্তু ফুটবলের গল্প যে এত সহজে শেষ হয় না, তা আবারও মনে করিয়ে দিল রিয়াল মাদ্রিদ। শেষ সাত মিনিটে তিন গোল করে মুহূর্তেই বদলে দিল ম্যাচের চিত্রনাট্য। রোমার সাজানো উৎসব পরিণত হলো হতাশায়, আর অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে মাঠ ছাড়ল রিয়াল।
রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচে শেষ বাঁশি বাজার আগে স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই- ফুটবলবিশ্বে বহুবার প্রমাণিত এই সত্য আবারও সামনে এল। মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে তিনটি গোল করে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে দিল স্প্যানিশ ক্লাবটি। কার্লোস এসপি, এনদ্রিক ও আন্তোনিও রুডিগারের গোলে ৪-৩ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল জোসে মরিনিওর দল। ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ শেষ পর্যন্ত জয়ে পরিণত হওয়ায় আবারও আলোচনায় উঠে এল ইউরোপীয় ফুটবলে রিয়ালের ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য।
এই জয়টি মরিনিওর জন্যও ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১-২২ মৌসুমে তার অধীনেই রোমা জিতেছিল কনফারেন্স লিগ। পরের মৌসুমে দলটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ইউরোপা লিগের ফাইনালে। সেই সাফল্যের স্মৃতি ধরে রাখতে গ্যালারিতে সমর্থকেরা প্রিয় কোচের নামে ব্যানারও টাঙিয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে সেই পরিচিত কোচের দলকেই দেখতে হলো প্রতিপক্ষের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য এগিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব রোমারই। ২০ মিনিটে মাতিয়াস সুলের পাস থেকে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া শটে দলকে এগিয়ে দেন মার্তেন দে রুন। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি লিড ধরে রাখতে পারেনি স্বাগতিকেরা। চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের শততম ম্যাচ খেলতে নামা কিলিয়ান এমবাপ্পের শট রোমার খেলোয়াড় জিয়ানলুকা মানচিনির গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। তাতে সমতায় ফেরে রিয়াল, আর টুর্নামেন্টে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭২-এ।
দ্বিতীয়ার্ধে দোনিয়েল মালেনের জোড়া গোলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় রোমা। প্রথম গোলের পেছনে ছিল ভিনিসিইয়াস জুনিয়রের ভুল। বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে সেটি হারালে সুযোগ কাজে লাগান মালেন। তার শট রিয়াল অধিনায়ক ফেদেরিকো ভালভের্দের গায়ে লেগে জালে প্রবেশ করে। এরপর ঠান্ডা মাথায় নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ডাচ ফরোয়ার্ড। শুরুতে অফসাইডের সংকেত দেওয়া হলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। স্কোরলাইন তখন ৩-১, আর রোমার জয় যেন সময়ের অপেক্ষা।
ম্যাচের শেষ দিকে রক্ষণ মজবুত করতে একের পর এক পরিবর্তন আনেন রোমার কোচ। দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থাকা দলের জন্য এমন কৌশল অস্বাভাবিক ছিল না। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে বাকি সময়টা পার করে দিতে পারলেই জয় নিশ্চিত। কিন্তু রিয়ালের বিপক্ষে শুধু রক্ষণ সামলে ফল ধরে রাখার পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায় রোমার জন্য।
অন্যদিকে, মরিনিওর পরিবর্তনগুলো ম্যাচে নতুন গতি এনে দেয়। আরদা গুলের মাঠে নামার পর রিয়ালের কর্নারগুলো ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ৮৩ মিনিটে এনদ্রিকের হেড গোলরক্ষক পিয়েরলুইজি গোল্লিনি ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি বলে গোল করে ব্যবধান কমান বদলি হিসেবে নামা কার্লোস এসপি। এই গোলেই ম্যাচে ফেরার আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় রিয়াল।
এরপর মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আবারও কেঁপে ওঠে রোমার রক্ষণ। গুলেরের কর্নার থেকে হেডে গোল করে স্কোরলাইন ৩-৩ করেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড এনদ্রিক। যে ম্যাচে কিছুক্ষণ আগেও জয় প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল, সেই ম্যাচেই তখন সমতায় ফিরেছে রিয়াল। গ্যালারির উচ্ছ্বাসের জায়গায় নেমে আসে উৎকণ্ঠা।
তবে সমতায় ফিরেই থেমে থাকেনি রিয়াল মাদ্রিদ। ৯০ মিনিটে গুলেরের আরেকটি সেট পিস থেকে কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ভলিতে বল জালে পাঠান আন্তোনিও রুডিগার। তাতেই ৩-১ থেকে ৪-৩ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্প্যানিশ ক্লাবটি। শেষ সাত মিনিটে তিন গোল - এক মুহূর্তে বদলে যায় পুরো ম্যাচের গল্প। যে স্টেডিয়ামে রোমার সমর্থকেরা জয়ের অপেক্ষায় ছিলেন, সেখানেই শেষ পর্যন্ত শুরু হয় রিয়ালের উল্লাস।
অলিম্পিক স্টেডিয়ামে মরিনিওর প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে টাঙানো হয়েছিল নানা ব্যানার। কিন্তু ম্যাচ শেষে সেই রাতের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে রইল তার দলের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। রোমার হাতে থাকা জয় শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে আবারও মনে করিয়ে দিল রিয়াল মাদ্রিদ - ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো গল্পেরই সমাপ্তি ঘটে না।
সংশ্লিষ্ট সংবাদ: রিয়াল মাদ্রিদ
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
