রবীন্দ্রনাথ আমাদেরই লোক। আমরা মানে এই আমজনতা, চাষি, কৃষক, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তার সঙ্গে এই মধ্যবিত্ত বটে। রবীন্দ্রনাথ উচ্চবিত্তেরও। রবীন্দ্রনাথকে আমরা সাধারণ মানুষের, মুক্তিকামী মানুষের রবীন্দ্রনাথ হিসেবেই দেখতে চাই। রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন বিবর্তনের মধ্যদিয়ে, কিশোর বয়সে তাকে ৬০ বছরের রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মেশাতে গেলে খটকা লাগবে। আবার শেষ বয়সের রবীন্দ্রনাথও আরেকটু আলাদা। এক সময় জাতীয়তাবাদে আস্থা রাখলেও জীবনের এক বিশেষ সময়ে তিনি জাতীয়তাবাদী ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন। পশ্চিমের অনেক দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদ কত নিষ্ঠুর হতে পারে তা তিনি লক্ষ করেছিলেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে খুব সহজভাবে আলোচনা করার বিষয়টি সহজ নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক’। রবীন্দ্রনাথ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে নগরের সব ক্লান্তি-শ্রান্তি ছেড়ে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তার এই চাওয়াটার পটভূমি মূলত আজকের বাংলাদেশ বিশেষ করে শিলাইদহ, শাজাদপুর, পতিসর এবং শান্তিনিকেতনের আশপাশের গ্রামগুলো, আদিবাসী মানুষ, বিশেষ করে সাঁওতালদের জীবনযাত্রা, উৎসব ইত্যাদি।
পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, শাহজাদপুর এবং পতিসরের জমিদার রবীন্দ্রনাথ যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাঁকো নির্মাণ করেছিলেন এবং গরিব প্রজাদের সব ঋণ মাফ করে দিয়ে যে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ছিল মানবতাবাদী এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি মুসলমান প্রজাদের সম্মানিত করেছেন, কৃষি ব্যাংক খুলেছেন, চাষবাসের নানা পরীক্ষা করেছেন, সমবায় নিয়ে লিখেছেন এবং নিজের পুত্রকে পাঠিয়েছেন আমেরিকায় কৃষিবিজ্ঞান পড়াতে। আর এসব তিনি করেছেন মূলত পল্লির জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য।
এসব থেকে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ সেকালেই যে প্রাগ্রসর সমাজভাবনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, আজকেও আমরা সেই ভাবনার পথেই অগ্রসর হচ্ছি এবং নানাভাবে তারই দ্বারস্থ হচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ তার চিন্তাভাবনা হাতে-কলমে পরীক্ষা করেছেন, সফল হয়তো সবক্ষেত্রে হননি, তথাপি একথা সত্য যে, তিনি সমাজ, মানুষ এবং সর্বোপরি মানবোন্নয়নের সার্বিক অনুষঙ্গ থেকে কখনই নিজেকে দূরে রাখেননি। রবীন্দ্রনাথকে যারা শুধু অধ্যাত্মবাদী, ভাববিলাসী, রোমান্টিক দিগ্বলয়ের কবি হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত কিংবা সাম্প্রদায়িক জ্বরে আক্রান্ত মায়োপিক দৃষ্টির জাতক, তারা রবীন্দ্রমানস থেকে হয় অনেক দূরে বসবাস করেন, না হয় স্বার্থকেন্দ্রিক মোহগ্রস্ততায় মাটি ও মানুষের কবি রবীন্দ্রনাথকে চিনতে পেরেও না চেনার ভান করেন। একথা আরও স্পষ্ট যে, খণ্ডিত, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে যারা রবীন্দ্রনাথকে মাপতে গিয়েছেন, তারা যুগে যুগেই ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। অবশ্য এ কথাও সত্য যে, এসব নিন্দুক সফল রবীন্দ্রর্চচার পথকে আরও বিস্তৃত করেছেন পরোক্ষভাবে, কালে কালে; বিরুদ্ধস্রোতেই রবীন্দ্রনাথ বিকশিত হয়েছেন, দাঁড়াবার জায়গাটা আরও শক্ত করেছেন, জনমানুষের কাছাকাছি এসেছেন।
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, ঔপনিষদিক শান্ত স্বভাবের ধেয়ানো পুরুষ; যে কারণে পশ্চিমের অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন একজন সেইন্ট বা ঋষি। এ ক্ষেত্রে তার পিতা ছাড়া আর একজন মনীষী তাকে কিছুটা প্রভাবিত করেছিলেন–তিনি হলেন লিও তলস্তয়। অক্সফোর্ড বক্তৃতামালার ‘দ্য রিলিজিয়ন অব ম্যান’ বক্তৃতায় (১৯৩০) তিনি সংস্কারমুক্ত উদারনৈতিক মানবধর্মের কথা বলেন। সেই বক্তৃতায় তিনি আমাদের বাউল সাধক হাসন রাজার মরমি-সংগীতের দর্শন নিয়েও কথা বলেন।
ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিকতা যে প্রাণহীন, তা তিনি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন গ্রামীণ জীবনের লুপ্ত গৌরব। রক্তকরবীর এই গানটিতে কবিকে স্পষ্ট দেখা যায় মাটিবর্তী জীবনের দিকে–
ফিরে চল্, ফিরে চল্, ফিরে চল্ মাটির টানে–
যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।
যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে, হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,
ডাক দিল যে গানে গানে।।
সেই মাটির টানে কবি পতিসরে কৃষক ও কৃষির উন্নতির জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কৃষি ব্যাংকই শুধু স্থাপন করেননি। আজকের মাইক্রো-ক্রেডিটেরও তিনিই অগ্রদূত এ দেশে। মানুষের কল্যাণই ছিল তার অন্যতম দর্শন। রবীন্দ্রনাথের এই গানের প্রায়োগিক রূপটিও আমরা দেখি বাংলাদেশে। আমি মনে করি, মাটি ও মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার, মাটির ডাকে সাড়া দেওয়ার এই পথেই রয়েছে আমাদের মুক্তি। কৃষিনির্ভর এই দেশের উন্নতির জন্য কৃষকের জীবনের উন্নতির বিকল্প নেই। রবীন্দ্রনাথ আজ থেকে অনেকদিন আগেই বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন। শান্তিনিকেতনের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতনও প্রতিষ্ঠিত করেছেন কৃষক ও কৃষির উন্নতির জন্য।
ৱরবীন্দ্রনাথ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করেছেন। বৈষম্য নানা ধরনেরই হতে পারে। বৈষম্য স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। তাই দরকার সমতার। সমতাই মানুষে মানুষে মিলনের পূর্ব শর্ত। রবীন্দ্রনাথের ‘অরূপ রতন’ নাটকে সেই সমতার বাণীই উচ্চারিত:
আমরা সবাই রাজা আমাদের এই
রাজার রাজত্বে।
নইলে মোদের রাজার সনে
মিলব কী স্বত্বে।
রবীন্দ্রনাথ মাটি ও মানুষের কাছাকাছি আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার এই অভিযান পুরোপুরি সফল হয়নি নানা কারণে। রবীন্দ্রনাথ একজন শিল্পী, কোনো সমাজতাত্ত্বিক নন। ফলে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার পথ বাতলে দেওয়া তার কাজ ছিল না। রাশিয়ার বিপ্লবের ধারাকে তিনি পছন্দ করেননি ঠিকই, কিন্তু তাদের সাম্যের আদর্শকে তিনি প্রশংসা করেছেন। যারা মানুষের মুক্তির জন্য লড়েছেন কিংবা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তিনি তাদের সমর্থন দিয়েছেন, সে লড়াই পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন। ১৯৩০ সালে কবি রাশিয়া ভ্রমণে গিয়ে মুগ্ধ হন। সেখানে কৃষক-শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষকে নতুনভাবে দেখার সুযোগটা তাকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি লিখেছেন, ‘বহুকাল থেকেই আশা করেছিলাম আমাদের জমিদারি যেন আমাদের প্রজাদেরই জমিদারি হয়–আমরা যেন ট্রাস্টির মতো থাকি।’ ‘এবার ফেরাও মোরে’ কবিতায় আমরা দেখি মানুষের প্রতি, বিশেষ করে লাঞ্ছিত মানবতার পক্ষে তার ব্যাকুল ব্যথাতুর চিত্তের আকুতি:
কবি, তবে উঠে এসো–যদি থাকে প্রাণ
তবে তাই লহ সাথে, তবে তাই করো আজি দান।
আমরা আগেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হলে তার বিবর্তনকে বুঝতে হবে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং গণমানুষের কাছাকাছি আসার বিষয়টি যে ব্যাপকতা লাভ করে, তা আমাদের সবারই জানা। হিন্দু-মুসলমান বিরোধের বিষয়টি তাকে নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। এ বিষয়ে তিনি ব্যাপক লিখেছেন, বক্তৃতা-বিবৃতিও দিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ‘দেশকে মুক্তি দিতে হলে দেশকে শিক্ষা দিতে হবে। গণমানুষের চেতনাকে শাণিত করার দৃঢ়প্রত্যয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা/ এই সব শ্রান্ত শুষ্ক-ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা’।
মানুষের প্রতি এই অকুণ্ঠ ভালোবাসাই রবীন্দ্রদর্শনের শেষ কথা। রবীন্দ্রনাথের অতি উদার মানবিক ধ্যান-ধারণা, মঙ্গল ও শুভত্বের চিন্তাভাবনা থেকে আমরা যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। শুধু আনুষ্ঠানিকতায় রবীন্দ্রনাথকে ধরা যাবে না, আমাদের জাতীয় জীবনে চাই রবীন্দ্রায়ণ; শুধু গুরুদেব, শুধু গীতাঞ্জলির রবীন্দ্রনাথ, শুধু সাধক কিংবা বাউল নয়, কর্মযোগী রবীন্দ্রনাথ, অস্পৃশ্য, অন্ত্যজ শ্রেণির, নিম্নবর্গের মানুষের পরম বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে চিনতে ও ধরতে না পারলে রবীন্দ্রনাথ যে আমাদেরই লোক এ কথার কোনো অর্থ হয় না। ‘পরিশেষে’র পান্থ কবিতায় কবি লিখেছেন–
শুধায়ো না মোরে তুমি মুক্তি কোথা, মুক্তি কারে কই
আমি তো সাধক নই, আমি গুরু নই।
আমি কবি, আছি
ধরণীর অতি কাছাকাছি...।
দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
