রাজধানীতে ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য বাড়লেও তালিকাভুক্ত অনেক অপরাধীই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় নাম, একাধিক মামলা, এমনকি একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়ার পরও জামিনে বেরিয়ে ফের ছিনতাইয়ে জড়াচ্ছে তারা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, কিছু ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ থাকায় তাদের কেউ কেউ নির্বিঘ্নে অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
গত কয়েক মাসের ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীর ৫০ থানার আওতায় ছিনতাই পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, পুলিশ সদস্যরাও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্তদের বাইরেও রাজধানীতে ছিনতাইকারীর একটি বড় অংশ সক্রিয়। তাদের অনেকে ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্ত। সুযোগ পেলেই ছুরি, চাপাতি কিংবা সামুরাইয়ের মতো দেশি অস্ত্র নিয়ে ছিনতাই করছে তারা। এসব ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। নতুন নতুন অপরাধী যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
বর্তমানে ডিএমপির আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে ১,৩৮৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ জন ওয়ারী বিভাগে। এ ছাড়া তেজগাঁও বিভাগে ২৪০, উত্তরা বিভাগে ২৪০, মতিঝিল বিভাগে ১৬৮, লালবাগ বিভাগে ১৫৯, রমনা বিভাগে ১৫২, গুলশান বিভাগে ৬৭ এবং মিরপুর বিভাগে ৫৩ জন রয়েছে। তালিকাভুক্তদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে এক থেকে সাতটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে তাদের অনেকে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে।
প্রতিদিন নতুন মুখও যুক্ত হচ্ছে ছিনতাইয়ে। ছয় মাস আগেও রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ছিল ৯৮৯। এর মধ্যেই ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় দেড়গুণ বেড়ে যাওয়া এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি ভাবিয়ে তুলেছে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
অপর একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ৯৭৯ ছিনতাইকারীর তালিকা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে এবং তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তথ্য অনুযায়ী মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে তালিকাভুক্ত রয়েছে ২১২ জন, মিরপুর-তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬, উত্তরা-গুলশান বিভাগে ১৬৪ এবং রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২৮৭ জন।
৪৬৬ হটস্পটে সক্রিয় ছিনতাইকারী
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী রাজধানী ও আশপাশের ৪৬৬ হটস্পটে ৯৬৯ সক্রিয় ছিনতাইকারী পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। ঢাকার দেড় শতাধিক স্থান ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
মামলা কম, প্রকৃত চিত্র অজানা
বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এসবির ক্রাইম ডেটাবেস অনুযায়ী গত মে মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ৩৩ ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময় সারা দেশে ১৬৭ ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে আগ্রহী হন না। ফলে নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন।
ডিএমপির ৫০ থানায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ২৫, মার্চে ২৯, এপ্রিলে ২৬ ও মে মাসে ৩৬টি মামলা হয়। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, সবুজবাগ, হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রবণতা বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তালিকায় থাকা রাজধানীর এলাকাভিত্তিক কয়েকজন ছিনতাইকারী
রাজধানীর পূর্ব বিভাগ : বাবুল, রাজীব আহম্মেদ আলামিন, বিল্লাল হোসেন, বিল্লাল ওস্তাদ, শাওন গাজী, বাদল সরদার, আব্দুল জব্বার, রফিক বেপারী, জসিম মাতুব্বর, জাকির হোসেন সিকদার, তরিকুল ইসলাম, সাগর, সজীব হোসেন, ইয়াছিন, আকাশ, রাজীব হৃদয়, নুনতা সাগর, সৌরভ মিয়া, সুজন সাগর, শামিম হোসেন, জাহাঙ্গীর মাতুব্বর, আ. রব, সাইফুল নুর আলম শাকিল প্রমুখ।
ফকিরাপুল ও আশপাশ এলাকা : রাজ্জাক, নাটাই সোহেল, মিলন, শাহিন, সাইফুল ইসলাম পলাশ, আতিকুর রহমান সুমন, মেহেদী হাসান, লিটন, সাব্বির হোসেন রাজন, সুমন মিয়া, আতিকুল ইসলাম, খোরশেদ আলম, সজল, আলী আশরাফ, কৌশিক সরদার, শাহীন আলম, মহিউদ্দিন, ফারুক হোসেন, বাবুল, লিটন, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।
সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড, জনপথের মোড়, যাত্রাবাড়ী : ফারুক হোসেন, বাবুল, লিটন, আনোয়ার হোসেন, মোতালেব, নূর আলম মদন, নূর হোসেন, হোসেন, রনি, জসিম প্রমুখ।
বর্তমানে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় ভাসমান : জসিম, সাজু, হাফিজুল, খায়রুল ইসলাম, শিরু মাদবর, আরিফুল ইসলাম, বোমা আরিফ, পারভেজ হাওলাদার, আলমগীর, আলমগীর মিয়া, রনি প্রমুখ।
যাত্রাবাড়ী মাছবাজার ও কাঁচাবাজার : মনির হোসেন, মিন্টু, সজীব, জমি, সুমন, সুজন, মোল্লা রাসেল, বাবা রাকিব, রাসেল, মুরগি সুমন, রিফাত ভূঁইয়া, ওমর ফারুক, শরিফুল ইসলাম, মেহেদী হাসান শুভ, সোহেল প্রমুখ।
ডেমরা থানার সাইনবোর্ড এলাকা : শাহিন, শাকিল, সোহেল, ইমরান হোসেন মুন্না, আজহারুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন, নজির হোসেন, বাপ্পি, আলী আকবর, রনি, শামীম ওরফে বুস, সজীব, নাদিম, ছোট সম্রাট, আমিনুল ইসলাম, আজিজ, মাহবুব আলম, গনেশ চন্দ্র বণিক, আজিজুল শেখ, শাহিন, জসিম মাতাব্বর প্রমুখ।
রামপুরা : সুজন, শওকত হোসেন রানা, মুনছুর আহম্মদ রিমন, রনি হাওলাদার, শরিফ, সোহাগ, সজিব, মুন্সীগঞ্জ রাসেল, কাজল, হানিফ, দ্বীন ইসলাম, সোহেল, মাউরা সোহেল, সুজন, আরমান, পারভেজ, শুভ দাস, শরিফুল, ইব্রাহীম সুলতান আহম্মদ নাদিম, মাইদুল ইসলাম, রনি, রাজ্য মিয়া, বাদশা মিয়া, হাসিবুল হাসান, ইদ্রিস আলী, মাসুদ, শান্ত, শাহিন, মুরগি শামীম, লালন মিয়া, রানা, ফরহাদ হোসেন।
সবুজবাগ থানা এলাকায় ভাসমান : ওয়াহিদ, সুজন, হেলাল, সাগর, ফারুক, হযরত আলী, রাসেল, সুমন।
মুগদা : মুগদা থানাধীন বিশ্বরোডের ঢালে মানিকনগর বিক্রমপুর সুইটস-নামীয় দোকানের সামনে পাকা রাস্তার উপর ও মুগদা থানা এলাকায় ভাসমান হাবিবুর রহমান জনি, সোহাগ, শাহীন হোসেন, রানা হোসেন মোল্লা, রিফাত, সাগর হোসেন, মাসুম খান, মিছির তালুকদার, সাজ্জাদ হোসেন, রিয়াজ, রিয়াজুল ইসলাম, শাওন প্রমুখ।
মিরপুর, শাহআলী, পল্লবী : রূপনগরের তানভীর, পল্লবীর নয়ন, শুভ, সুমন, সোহেল, আপন, রবিন, সজল, সাভারের সুজন শেখ, মানিকগঞ্জের ফারুক হোসেন, দারুস সালামের জুয়েল, রবিন, সজীব, সোহেল, শাহআলী এলাকার শাতিল, জীবন, ইয়াসিন প্রমুখ।
কল্যাণপুর : রমজান আলী, রিপন, রাকিব, গাবতলীর সজীব, জাফর, লিমন; পল্লবীর ফয়সাল, হাবিবুর রহমান, আক্তার, শান্ত, নাদিম প্রমুখ।
সহজে জামিনে উদ্বেগ
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, চুরি-ছিনতাইকে এখন আর সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব অপরাধে জড়িত অনেকে পেশাদার এবং তারা মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে। তার মতে, গ্রেপ্তারের পর সহজে জামিন পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে আইনি সংস্কার প্রয়োজন। এভাবে চলতে থাকলে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য
ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে চ্যালেঞ্জ এবং অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগে জানতে চাওয়া হলে আমার দেশকে দেওয়া জবাবে বলা হয়, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
জবাবে আরো বলা হয়, পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আকতার হোসেন বলেন, তার কাছে ছিনতাইকারীদের কোনো তালিকা নেই। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ডিএমপি নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে প্রতিদিনই ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হচ্ছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যার তালিকাও দেওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।
