দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও তুলনামূলক কম আক্রান্তের ঘটনা দেখা গেছে সিলেটে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪২৬ জন, মারা যান দুজন। একই সময়ে রংপুর বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬১, তবে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কোনো তথ্য নথিভুক্ত হয়নি। দেশের অন্য কয়েকটি বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি জমে থাকার ধরন, এডিস মশার বিস্তার, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষের যাতায়াত। তবে এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
একসময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খুলনা ও বরিশালের মতো বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। এর বিপরীতে সিলেট ও রংপুরে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। ওই বছর সিলেট বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৫, মৃত্যু হয় একজনের। রংপুরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৫৪০ জন, মারা যান ১০ জন।
২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১। ওই বছর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। সিলেট ও রংপুরে আক্রান্তের সংখ্যা জাতীয় পরিস্থিতির তুলনায় কম থাকলেও এ তথ্য থেকে একা কোনো নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা যায় না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মাহবুবুল আলমের মতে, সিলেটে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকার পেছনে বৃষ্টিপাতের ধরন, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং এডিস মশার বিস্তারের বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে।
মাহবুবুল আলম বলেন, সিলেটে বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এতে অনেক জায়গায় পানি প্রবাহিত থাকে। ফলে কোথাও পানি জমে থেকে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরির সুযোগ তুলনামূলক কম হতে পারে।
তবে বৃষ্টিপাত বেশি হলেই যে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমবে, এমন নয়। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম কিংবা ট্যাংকে পানি জমে থাকলে সেখানেও এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। তাই বৃষ্টির পর পানি জমার স্থানগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মাহবুবুল আলম জানান, সিলেটের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের বড় অংশ ঢাকা থেকে আসেন। তাদের অনেকে ঢাকায় আক্রান্ত হয়ে সিলেটে চিকিৎসা নিতে আসেন বলে ধারণা করা হয়। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও মশা নিধন অভিযানও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
সিলেটের মতো রংপুর বিভাগেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নগরায়ণের মাত্রা, মানুষের যাতায়াত এবং এডিস মশার ঘনত্বের বিষয়গুলো সামনে এনেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ জিএম সাইফুর রহমান বলেন, নগরায়ণের সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে। শহরে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে তা এডিস মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে। রংপুরে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি জানান, রাজশাহী বিভাগের তুলনায় রংপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকার পেছনেও নগরায়ণের পার্থক্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এডিস মশার ঘনত্ব, স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের চলাচলের বিষয়গুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক ওয়াজেদ আলীও ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষের যাতায়াত তুলনামূলক কম হওয়া এবং এডিস মশার ঘনত্ব কম থাকাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, উপকূলীয় খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ার পেছনে পানি সংরক্ষণের ধরনও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ জিএম সাইফুর রহমান।
তিনি বলেন, লবণাক্ততার কারণে এসব এলাকার অনেক পরিবারকে পাত্র ও ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখতে হয়। এসব পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে। আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের ধরনও মশার বিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকার অর্থ এই নয় যে বিভাগটি ঝুঁকিমুক্ত। ঢাকা বা অন্য ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা থেকে মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমে সংক্রমিত ব্যক্তি সিলেটে আসতে পারেন। স্থানীয়ভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি হলে সেখান থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর প্রকোপ নির্ধারণে শুধু বৃষ্টিপাত বা নগরায়ণ নয়, একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে। সিলেটে আক্রান্তের সংখ্যা কম থাকার কারণ আরও নির্দিষ্টভাবে জানতে স্থানীয় পর্যায়ে এডিস মশার ঘনত্ব, প্রজননস্থল, রোগীদের সংক্রমণের উৎস এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকা ও খুলনা বিভাগের পর তৃতীয় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। এ বিভাগে মারা গেছেন ২৭ জন। এরপর বরিশালে ২৪ জন, ময়মনসিংহে ২৩ জন, রাজশাহীতে ২২ জন এবং রংপুরে ৬ জন মারা গেছেন। সবচেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগে, ৩ জন।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
