একই মাঠে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। একদিকে আতরের সুবাসে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, অন্যদিকে ধূপকাঠির গন্ধে পূজার্চনায় ব্যস্ত ভক্তরা। আজান শুরু হলে থেমে যায় মন্দিরের ঢাকঢোল, নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজার জামে মসজিদ ও সার্বজনীন দুর্গামন্দির।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একই মাঠে মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির। প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিরোধ তো নেই-ই, বরং স্থানীয় মুসলিম নারী-পুরুষও প্রতিবেশী হিন্দুদের পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫৪ বছর ধরে পাশাপাশি অবস্থিত দুই উপাসনালয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। দুর্গাপূজার সময় মন্দিরে ঢাকঢোল, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। রাতে চলে আরতি। তবে মসজিদে আজান শুরু হলেই পূজার আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ রাখেন পূজারি ও ভক্তরা। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার্চনা।
মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, “মসজিদে আজান শুরু হলেই আমরা পুরো অনুষ্ঠানে বিরতি দিই। নামাজ শেষে আবার আমাদের কার্যক্রম শুরু করি। আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারও বিরক্তির কারণ হননি কখনোই। বরং দুই ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের এই পবিত্র স্থান দুটি আগলে রেখেছেন।”
স্থানীয় সমাজসেবক মাকসুদ মৃধা বলেন, এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও এভাবেই সম্প্রীতি বজায় রেখেছেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা পূজা দেখতে মণ্ডপে যান। আবার ঈদ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানেও তাঁদের হিন্দু প্রতিবেশীরা অংশ নেন।
মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস বলেন, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে একই মাঠে নির্মাণ করা হয় আধুনা জামে মসজিদ। মন্দির থেকে মাত্র ১০ ফুট দূরে অবস্থিত মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, আর মন্দিরে পূজার্চনা করেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।
তিনি বলেন, মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি হলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
দীর্ঘ ৫৪ বছরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির বন্ধন। ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে পাশাপাশি, অথচ কারও প্রতি কারও বিদ্বেষ নেই। স্থানীয়দের কাছে এই সহাবস্থান এখন ঐতিহ্যের অংশ।
আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, “এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলেই হিন্দু ভাইয়েরা ঢাকঢোলের আওয়াজ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলে আবার তাঁদের কার্যক্রম শুরু হয়। বছরের পর বছর ধরে এখানে সবাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন। কেউ কারও বিরক্তির কারণ হননি কখনো।”
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একই স্থানে মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, আমরা এমন সমাজব্যবস্থাই চাই, যেখানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করবেন।
