শরীরের বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে বের করতে কিডনি প্রতিনিয়ত কাজ করে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করলেও প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় তা বোঝা যায় না। ফলে বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও কিডনির ভেতরে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. চৈত্রালি গাওড়ে জানিয়েছেন, কিডনির রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা কঠিন। কারণ, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই তখন স্পষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে সাধারণ কিছু রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে উপসর্গ দেখা দেয়ার আগেই কিডনির কার্যক্ষমতার পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
কিডনির সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ কী
কিডনির সমস্যা হলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ সব সময় সরাসরি কিডনির রোগের ইঙ্গিত দেয় না। তাই লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোও গুরুত্বপূর্ণ। কিডনির সমস্যার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
> চোখের চারপাশে বা গোড়ালিতে ফোলাভাব।
> প্রস্রাবের পরিমাণ বা প্রস্রাব করার ঘনত্বে পরিবর্তন।
> প্রস্রাবে ফেনা দেখা যাওয়া।
> প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
> দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি।
> বমি বমি ভাব কিংবা ক্ষুধা কমে যাওয়া।
> কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই শরীরে চুলকানি।
> রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া।
চিকিৎসক চৈত্রালি গাওড়ের মতে, প্রস্রাবের পরিমাণ, ধরন বা বৈশিষ্ট্যে কোনো পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে কিডনির সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতি করতে পারে। আবার কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, এই দুই সমস্যার সম্পর্ক পরস্পরনির্ভর।
কিডনি ভালো আছে কি না বুঝতে ৩টি পরীক্ষা
কিডনির স্বাস্থ্য মূল্যায়নে সাধারণত রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা এবং রক্তচাপ পরিমাপ করা হয়। প্রতিটি পরীক্ষাই কিডনির অবস্থা সম্পর্কে আলাদা ধরনের তথ্য দেয়।
১. রক্তে ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর পরীক্ষা
কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায় হলো রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা পরীক্ষা করা। ক্রিয়েটিনিন শরীরের একটি বর্জ্য পদার্থ, যা সাধারণত কিডনি রক্ত থেকে ছেঁকে বের করে দেয়। রক্তে এই পদার্থের মাত্রা পরিমাপ করে ইজিএফআর বা এস্টিমেটেড গ্লোমেরুলার ফিলট্রেশন রেট নির্ণয় করা হয়। এর মাধ্যমে কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে বের করছে, তার একটি আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়।
চিকিৎসক চৈত্রালি গাওড়ে জানান, সিরাম ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর কিডনির কার্যক্ষমতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে শুধু একটি পরীক্ষার ফল দেখেই কিডনির অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। কারণ, বয়স, পেশির পরিমাণ এবং শরীরে পানির ভারসাম্যের মতো বিষয় পরীক্ষার ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ফল অস্বাভাবিক হলে চিকিৎসক প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা করতে দিতে পারেন অথবা অন্যান্য শারীরিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তা মূল্যায়ন করতে পারেন।
২. প্রস্রাবে অ্যালবুমিন-টু-ক্রিয়েটিনিন রেশিও
কিডনির সমস্যা শনাক্ত করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো প্রস্রাবে অ্যালবুমিন-টু-ক্রিয়েটিনিন রেশিও বা ইউএসিআর।
অ্যালবুমিন এক ধরনের প্রোটিন। সাধারণত কিডনি রক্ত ছেঁকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়ার সময় প্রয়োজনীয় প্রোটিন শরীরে ধরে রাখে। কিন্তু কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যালবুমিন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে। ইউএসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি যাচাই করা হয়। কিডনির ছাঁকনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আগেও এই পরীক্ষায় কিডনির ক্ষতির প্রাথমিক সংকেত পাওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসক গাওড়ের মতে, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য এই পরীক্ষা সাধারণত ব্যবহার করা হয়। কিডনির কার্যক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হওয়ার আগেই এটি কিছু অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
৩. রক্তচাপ পরীক্ষা
কিডনির স্বাস্থ্য মূল্যায়নে রক্তচাপ মাপাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উচ্চ রক্তচাপ যেমন কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তেমনি কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তাই কিডনির অবস্থা মূল্যায়নের সময় রক্তচাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলেই কিডনি সম্পূর্ণ সুস্থ, এমন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। আবার রক্তচাপ বেশি হলেই যে কিডনির রোগ হয়েছে, তাও নয়। অন্যান্য পরীক্ষার ফল ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হয়।
কত দিন পরপর কিডনি পরীক্ষা করাবেন
যাদের কিডনির রোগের পরিচিত কোনো ঝুঁকি নেই, তারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাই করতে পারেন। তবে কত ঘন ঘন পরীক্ষা করাতে হবে, তা বয়স ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, কিছু মানুষের নিয়মিত বিরতিতে কিডনি পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—
> ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি।
> উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তি।
> স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তি।
> পরিবারে কিডনির রোগের ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি।
> হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
> নিয়মিত নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহার করেন এমন ব্যক্তি।
> এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত।
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তাই নিজেকে সুস্থ মনে হওয়া মানেই কিডনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে, এমন নয়। ডা. চৈত্রালি গাওড়ের মতে, রক্ত ও প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষার মাধ্যমে কখনো কখনো উপসর্গ দেখা দেয়ার আগেই কিডনির কার্যক্ষমতার পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব।
