সংবাদ · সাধারণ
চায়ের সবুজে দুর্গোৎসবের রং ১০২৩ মণ্ডপে
১৮/১০/২০২৬

মৌলভীবাজারের চায়ের সবুজ পাহাড়, টিলার সারি আর চা-বাগানের নৈসর্গিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের রং। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে পূজা-অর্চনা, ভক্তদের আনাগোনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও উৎসবের আমেজ। কোথাও ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা, কোথাও নান্দনিক সাজসজ্জা, আবার কোথাও চা-শ্রমিক অধ্যুষিত জনপদে ধর্মীয় আবহে মিলেছে সম্প্রীতির বার্তা।এ বছর জেলার সাত উপজেলায় মোট ১ হাজার ২৩টি পূজামণ্ডপে উদ্যাপিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও বাড়ছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। ১০২৩ পূজামণ্ডপজেলা-জুড়ে পূজার আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ রয়েছে কুলাউড়া উপজেলায়। উপজেলা-ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, কুলাউড়ায় ২২৭টি, শ্রীমঙ্গলে ১৭৩টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি, বড়লেখায় ১৪৬টি, রাজনগরে ১৩৬টি, মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ১১১টি এবং জুড়ীতে ৭৬টি পূজামণ্ডপ রয়েছে।প্রতিটি মণ্ডপ ঘিরে স্থানীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, পূজার আনুষ্ঠানিকতা এবং দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে উৎসবকে নির্বিঘ্ন করতে ব্যস্ত পূজা উদ্যাপন কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।স্বরলিপি সংঘে ভিড়শ্রীমঙ্গলের শাপলাবাগ এলাকার স্বরলিপি সংঘের পূজামণ্ডপ ঘিরে রয়েছে দর্শনার্থীদের বিশেষ আগ্রহ। প্রতিমার সৌন্দর্য, মণ্ডপের সাজসজ্জা ও উৎসবের পরিবেশ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে সমবেত হচ্ছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, পূজার আনুষ্ঠানিকতা দেখা এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে মুখর হয়ে উঠছে আশপাশের এলাকা।শ্রীমঙ্গল শহর ও আশপাশের চা-বাগান এলাকায় পূজার আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও প্রকাশ ঘটছে। চা-শ্রমিক সম্প্রদায়ের বসতিগুলোতে পূজামণ্ডপ ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বন্ধনও হয়ে উঠেছে উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।পাঁচগাঁওয়ের লাল প্রতিমামৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজা দীর্ঘদিন ধরে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য ও পরিচিতির জন্য আলোচিত। এখানকার লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমা দেখতে প্রতিবছরই ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগ্রহ দেখা যায়। প্রতিমার বিশেষ রূপকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নানা বিশ্বাস ও জনশ্রুতি রয়েছে। এসব বিশ্বাস স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ হলেও সেগুলোকে লোকবিশ্বাস হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।পাঁচগাঁওয়ের পূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। ফলে দুর্গোৎসবের সময়ে এ এলাকার প্রতি ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়ে।শিববাড়ীতে ভক্তসমাগমকুলাউড়ার কাদিপুর শিববাড়ীও দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ভক্তদের কাছে পরিচিত একটি ধর্মীয় স্থান। পূজার দিনগুলোতে মন্দির ও আশপাশের এলাকায় ভক্তদের উপস্থিতি বাড়ে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, প্রার্থনা ও পারিবারিকভাবে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে উৎসবের দিনগুলো কাটান স্থানীয় বাসিন্দারা।ভক্তদের ভিড়জেলার বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে স্থানীয় ঐতিহ্যের ছাপ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সাজসজ্জা ও আয়োজনের বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্যই মৌলভীবাজারের দুর্গোৎসবকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।পর্যটনেও বাড়ছে আগ্রহদুর্গাপূজার ছুটিকে ঘিরে মৌলভীবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বাইক্কা বিল, ভাড়াউড়া লেক ও লাল পাহাড়ের মতো দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে পর্যটকদের। পাশাপাশি খাসিয়া ও মণিপুরি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জানার আগ্রহও অনেকের কাছে ভ্রমণের বাড়তি আকর্ষণ।জেলার অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, পাথারিয়া পাহাড় ও কালাপাহাড়। প্রকৃতি, বন, জলাশয় ও পাহাড়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এসব স্থান দুর্গোৎসবের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করতে পারে।পর্যটন ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উৎসবকে সামনে রেখে বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে আগাম বুকিং ভালো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বুকিংয়ের হার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ছুটির প্রথম তিন দিনেও পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন তারা।হ্যালো শ্রীমঙ্গল ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী তাজুল ইসলাম জাভেদ জানান, পর্যটকদের আগ্রহ ও আগাম বুকিং আশাব্যঞ্জক। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চলাচল পরিস্থিতি এবং ট্রেনের টিকিটের অপ্রতুলতা পর্যটকদের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতানিরাপত্তায় তৎপরতাদুর্গোৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটন এলাকাগুলোতে দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।সীমান্তবর্তী মণ্ডপে নজরদারিবিজিবি শ্রীমঙ্গল সেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, সেক্টরের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৩৩১ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এ সেক্টরের আওতায় রয়েছে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি), বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়ন (৫২ বিজিবি) ও হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৫ বিজিবি)।দুর্গাপূজা উপলক্ষে সেক্টরের আওতাধীন মোট ২৩৭টি পূজামণ্ডপকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখার কথা জানিয়েছে বিজিবি। এর মধ্যে সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ২০৬টি এবং ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের তিন কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ৩১টি মণ্ডপ। ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত নিরাপত্তা কার্যক্রমে ৩৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েনের তথ্যও জানিয়েছে বাহিনী। নজরদারির কাজে ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি ‘শারদীয় সুরক্ষা’ ডিজিটাল অ্যাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।গত ১৭ অক্টোবর বিজিবি শ্রীমঙ্গল সেক্টর কমান্ডার কর্নেল বি এম তৌহিদ হাসান, এএফডব্লিউসি, পিএসসি হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মণ্টোলা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার গিলাতলী জগন্নাথ দেবের আখড়া পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে সেক্টর কমান্ডার মণ্ডপের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং পূজামণ্ডপের সভাপতির হাতে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন।বিজিবির পক্ষ থেকে গুজব, অপতথ্য ও সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো তৎপরতা চোখে পড়লে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনটি ব্যাটালিয়নের অভিযানে মাদক ও অন্যান্য চোরাচালানি পণ্য জব্দ এবং ৭৪ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। জব্দ পণ্যের ঘোষিত মূল্য ৮ হাজার ৭২৩ কোটি ৯৮ লাখ ১১ হাজার ১১৪ টাকা বলে জানানো হয়েছে। এ হিসাব প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর মূল বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে অঙ্ক ও একক মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।শ্রীমঙ্গলে নিরাপত্তা তৎপরতা১৭ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম পরিদর্শন করেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন—এসআরবি-৯-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মো. তাজমিনুর রহমান চৌধুরী, পিএসসি, জিডি (পি)—প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী। পরিদর্শনকালে তিনি দুর্গাপূজার নিরাপত্তা, শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।এদিকে পূজামণ্ডপগুলোতে আনসার-ভিডিপি সদস্য ও পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে, বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায়, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। পূজার সময় দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল, যানজট কমানো এবং জনসমাগম সামলানো সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর অন্যতম দায়িত্ব।সীমান্তবর্তী মণ্ডপে বিজিবির বিশেষ নজরদারিট্যুরিস্ট পুলিশ মৌলভীবাজার জোন ও শ্রীমঙ্গল থানার পক্ষ থেকেও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আগত দর্শনার্থীদের সতর্ক থাকা, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মেনে চলা এবং কোনো সমস্যায় পড়লে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।সম্প্রীতি ও দায়িত্ববোধমৌলভীবাজারের দুর্গোৎসব কেবল পূজার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন, পর্যটন সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের চিত্র। চা-বাগানের শ্রমজীবী জনপদ থেকে শহরের ব্যস্ত মণ্ডপ—সবখানেই উৎসব মানুষের মধ্যে আনন্দ ও মিলনের উপলক্ষ তৈরি করে।তবে উৎসবের আনন্দ অটুট রাখতে নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা, পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গুজব-উসকানি থেকে সতর্ক থাকা। পূজা উদ্যাপন কমিটি, স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগেই সম্ভব শান্তিপূর্ণ আয়োজন।চায়ের সবুজে ঘেরা মৌলভীবাজারে ১ হাজার ২৩টি পূজামণ্ডপের এই উৎসব তাই ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি ঐতিহ্য, পর্যটন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক সম্মিলিত ছবি হয়ে উঠেছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗