শরতের আকাশে কাশফুলের দোল। বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে শারদীয় পূজার ঢাকের বোল। স্বাভাবিকভাবেই বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ আসার কথা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বহু মণ্ডপ কমিটির সদস্য এখন প্রতিমার সাজসজ্জার চেয়ে বেশি ভাবছেন রাতের প্রতিমা পাহারা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন আর কোথাও কোনো গুজব ছড়ায় কি না তা নিয়ে। উৎসবের আগে আনন্দের জায়গা যদি শঙ্কা দখল করে নেয়, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও বড় একটা গলদ আছে। নির্ভয়ে নিজ ধর্ম পালন প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। পূজা আয়োজন কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, অধিকার।
মণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর ও প্রতিমা অবমাননার ঘটনা এ দেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো খবর নয়। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা নিন্দা জানিয়েছি, তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর প্রস্তুতি এক জিনিস নয়। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের একটাই শিক্ষা দেয়। সেটি হচ্ছে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর হা-হুতাশ করার চেয়ে সেই ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সেই বিষয়ে অধিক মনোযোগী হওয়া।
প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রতিবছরই তো পূজা হয়; বেশির ভাগ মণ্ডপে কিছুই ঘটে না। তাহলে এত উদ্বেগ কেন? উত্তর হলো, নিরাপত্তা মাপা হয় সবচেয়ে দুর্বল মণ্ডপটির অবস্থা চিন্তা করে। শত মণ্ডপ নির্বিঘ্নে উদযাপিত হলেও একটি মণ্ডপে হামলা হলে সেই ভয় ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। একবার আস্থা ভাঙলে তা জোড়া লাগাতে বহু বছর সময় লেগে যায়। তাই ‘সব ঠিক আছে’ বলে দায় সারা নয়; বরং যেখানে ঝুঁকি আছে, সেখানে বাড়তি মনোযোগ দেওয়াই সময়ের দাবি। উদ্বেগ থাকাটাই প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে।
এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ‘হায় হায়’ করার চেয়ে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে সেই ঘটনার চক্রান্ত অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেওয়া শ্রেয়। কারা গুজব ছড়াতে পারে, কোথায় উত্তেজনা জমছে, কোন এলাকা তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ—এসব আগেভাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। এর সঙ্গে চাই আগেভাগে প্রশাসনের সমন্বয় সভা, হটলাইন চালু এবং অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। প্রতিটি মণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন, সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলো এবং রাতে পাহারা নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক মাধ্যমে একটি ভুয়া পোস্ট বা কাটছাঁট করা ছবি মুহূর্তে একটি এলাকাকে অগ্নিগর্ভ করে তুলতে পারে। তাই গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে সংঘর্ষ বাধানোর চেষ্টা কঠোর হাতে রোধ করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কিছু বিশ্বাস না করা এবং শেয়ার না করার দায়িত্ব নাগরিকদের ওপর বর্তায়।
অতীতের হামলাকারীদের বিচার না হলে অপরাধীরা সাহস পায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই পরবর্তী হামলার জন্য সবচেয়ে বড় উসকানি। তাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আস্থা ফেরানোর জন্য অতীব জরুরি। প্রয়োজন হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অপরাধী যেন বুঝতে পারে, এ দেশে মণ্ডপে হাত দিলে পার পাওয়া যায় না।
প্রতিবেশী মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানো বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। তবে এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, কিছু কট্টরপন্থি মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি পূজামণ্ডপ পাহারা দেওয়ার নামে মণ্ডপে গিয়ে বসে থেকেছেন। তাদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু এর একটি বাস্তবভিত্তিক সমস্যা আছে। অন্য ধর্মের লোক পাহারার নামে মণ্ডপে ঢুকে অবস্থান নিলে যাদের পূজা, তারাই মণ্ডপে যেতে বাধাগ্রস্ত হন। বিশেষ করে সনাতন ধর্মের মেয়েদের জন্য পূজার আচার পালন করা তখন খুবই বিব্রতকর হয়ে পড়ে। তাই এই ধরনের অতিউৎসাহকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। যে ধর্মের উৎসব, তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য মণ্ডপের পরিসর ছেড়ে দিতে হবে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের অবশ্যই দায়িত্ব আছে; তবে তা পাহারার নামে মণ্ডপে প্রবেশের মাধ্যমে নয়। সম্প্রীতি কমিটি গঠনের মাধ্যমে এলাকার বিভিন্ন স্থানে নজরদারি বাড়ানো এবং কোনো অসংলগ্নতা দেখামাত্র স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করার মধ্য দিয়েই সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। মণ্ডপের ভেতরে ঢুকে ভিড় না করে বরং নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে সর্বাত্মক সাহায্য করাই অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রকৃত দায়িত্ব।
পূজার ভিড়ে হয়রানি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এ জন্য পৃথক ব্যবস্থা তথা স্বেচ্ছাসেবী দল এবং হারানো শিশু সহায়তা কেন্দ্র থাকা দরকার। প্রয়োজনে নারী স্বেচ্ছাসেবক ও নারী পুলিশ সদস্য মোতায়েন করতে হবে, যাতে নারী ও শিশুরা নির্ভয়ে ও স্বস্তিতে উৎসবে অংশ নিতে পারেন।
রাজনৈতিক দল ও নেতাদের স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে; নিজ কর্মীদের দ্বারা কোনো হামলা বা চাঁদাবাজি হবে না—এই নিশ্চয়তা তাদের দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মনে রাখতে হবে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় সরকার তথা তাদের দল এড়াতে পারে না। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সরকার এবং তাদের দলের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে। তাই নিজ দলের স্বার্থেই তাদের উচিত প্রো-অ্যাক্টিভলি কাজ করা, অর্থাৎ সমস্যা তৈরি হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেই মাঠে থাকা।
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। উসকানিমূলক শিরোনাম বা অযাচাইকৃত খবর নয়, বরং সম্প্রীতির ইতিবাচক গল্প তুলে ধরাই হোক তাদের অগ্রাধিকার। যেখানে প্রতিবেশীরা একসঙ্গে উৎসব ভাগ করে নিয়েছেন, সেসব খবর সমাজে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে।
ভুলে গেলে চলবে না যে এই দেশ কোনো একক ধর্মের নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, সেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই সমান নাগরিক। ধর্মের নামে ভয় দেখানো, উসকানি দেওয়া বা অন্যের উৎসবে আঘাত হানা সেই চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। যাঁরা এমন কাজ করেন, তারা কোনো ধর্মেরই প্রতিনিধি নন। কোনো ধর্মই নিরীহ মানুষের উপাসনালয়ে হামলা শেখায় না। ধর্মের মুখোশ পরা মৌলবাদ আদতে ধর্মেরও শত্রু এবং দেশেরও শত্রু।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। যে প্রতিবেশী চুপ করে থাকেন অথবা যে বন্ধু ঘৃণার পোস্টে হাসির ইমোজি দেন কিংবা যে সহকর্মী ‘আমার কী দরকার’ বলে সরে যান, তাদের নীরবতাই অজান্তে চরমপন্থির হাত শক্ত করে। অথচ নিঃসন্দেহে সংখ্যায় শান্তিপ্রিয় মানুষই অনেক বেশি। শুধু দরকার সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ কণ্ঠের জেগে ওঠা। একজন মুসলিম যখন প্রকাশ্যে বলেন, “আমার হিন্দু প্রতিবেশীর পূজায় আঘাত আমার ধর্মেরও অপমান’, তখন চরমপন্থিরা চুপসে যান। একজন হিন্দু যখন নির্ভয়ে নিজের অধিকারের কথা বলেন, তখন তিনি পুরো সমাজের স্বাধীনতার পক্ষেই কথা বলেন। এই সাহস, এই ঐক্য, এই উচ্চকণ্ঠই ভয়ের সংস্কৃতিকে হারাতে পারে।
আমাদের খেয়াল রাখতে হবে পূজার ঢাকের শব্দ যেন আতঙ্কের নয়, বরং আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। মণ্ডপ কমিটির সদস্যরা যেন রাতে নির্ভাবনায় ঘুমাতে পারেন। মায়েরা যেন সন্তানের হাত ধরে নির্ভয়ে প্রতিমা দেখতে যেতে পারেন। এটাই হোক রাষ্ট্রের কাছে আমাদের চাওয়া। ভয়মুক্ত পূজা মানে শুধু একটি সম্প্রদায়ের স্বস্তি নয়, এটি একটি নিরাপদ, সহনশীল ও মানবিক রাষ্ট্রের মাপকাঠি। সেই মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়ার দায় আমাদের সবার।
ফারাবী বিন জহির:সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী। ইমেইল: fbzahir@gmail.com
