নাজমুল হাসান
সমাজের ভবিষ্যৎ দর্পণ যখন কিশোর প্রজন্ম, তখন আমরা চারিদিকে দেখতে পাই একদল কিশোরের অন্ধকার এক চিত্র। সে চিত্রের ঠিক পাশাপাশি অবদমিত হতে থাকে তাদের মানসিকতা, সমাজের মূল্যবোধ, মানবাধিকার। কিশোর গ্যাং সে ভয়াবহ চিত্র যা সমাজের শেকড়ে আজ প্রোথিত।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতেই বেপরোয়া কিশোররা গ্যাং বানিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোরদের নিয়ে গড়ে ওঠে এসব গ্যাং। তারা চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকগ্রহণ, মাদকবিক্রি, মারামারি এই ধরনের নানান সমাজবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
কিশোর গ্যাং বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ পরিবারের যথাযথ নজরদারির অভাব। অনেক অভিভাবক কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানদের গতিবিধির প্রতি নজর রাখেন না, এমনকি তার সন্তানের বন্ধু সার্কেল সম্পর্কেও জানেন না। আরেকটি অন্যতম কারণ নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং সুস্থ বিনোদনের সংকট। শহরের কিশোররা পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ পায় না। ফলস্বরূপ, তারা প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। সহজেই অপরাধমূলক কনটেন্ট এবং গ্যাং কালচারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এছাড়াও, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি তাদের স্বার্থের জন্য এইসব কিশোরদের ব্যবহার করে। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
শহরের বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, বস্তি, নির্জন স্থান ও অপর্যাপ্ত সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পরিবেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষ্য করা যায়। একবার একটি গ্যাং গড়ে উঠলে তারা নতুন সদস্য সংগ্রহ করে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করে। এভাবে ছোট একটি দল ধীরে ধীরে বড় হয়ে এলাকায় ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর পড়ে না; বরং স্থানীয় নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি ও জনজীবনের ওপরও পড়ে। কিশোর গ্যাংয়ের এই দ্রুত বিস্তার রোধ করতে না পারলে সামাজিক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। তাই এর প্রতিকারে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে; সন্তানের মানসিক পরিবর্তন ও চলাফেরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা অর্জনের শিক্ষা বাড়াতে হবে। এরপর, পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে যাতে কিশোররা গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত থাকে।
সে সাথে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকি, ক্লাসে নিয়মিত সেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও পূর্বের গ্যাংগুলোকে নির্মূল করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
কিশোর গ্যাং শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক ও পারিবারিক সংকটের প্রতিফলন। তাই কিশোরদের অপরাধী হিসেবে দূরে ঠেলে না দিয়ে তাদের ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করলে কিশোরদের ইতিবাচক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আজকের কিশোররাই আগামী দিনের নাগরিক; তাই তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করাই একটি নিরাপদ ও সুন্দর সমাজ গঠনের অন্যতম শর্ত। লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
