Published on
:
4 min read
সৌভিক চক্রবর্তী
অক্সফোর্ডের জর্ডন কলেজের আশ্রিতা হয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছিল এগারো বছরের অনাথ মেয়ে লাইরা বেলাকোয়া। কিন্তু যে দিন সে জানতে পারল, তার একমাত্র জীবিত আত্মীয়, বিজ্ঞানী-অভিযাত্রী, কাকা লর্ড অ্যাজ়রিয়েল-কে বিষ খাওয়াতে চান কলেজেরই মাস্টার ডক্টর কার্নে, সে দিন থেকে তার জীবন বদলে গেল। লাইরার হস্তক্ষেপে কাকার প্রাণ বাঁচলেও বিপদের মেঘ পুরোপুরি কাটল না। শহরে শুরু হলো ‘গবলার’ নামক ছেলেধরা দলের তাণ্ডব, যখন তখন রাস্তাঘাট থেকে উধাও হয়ে যেতে লাগল নিম্নবিত্ত ও জিপশিয়ান পরিবারের শিশুরা। এরই মধ্যে লাইরার সঙ্গে আলাপ হলো অভিজাত-বংশীয়া শিক্ষাবিদ মারিসা কুল্টারের, তাকে সহকারী করে লন্ডনে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন ভদ্রমহিলা। রাজি হলো লাইরা, এবং অক্সফোর্ড ছাড়ার সময়ে খবর পেল, তার দীর্ঘ দিনের খেলার সাথী রজারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
লন্ডন পৌঁছে লাইরা বুঝতে পারল, সে ম্যাজিস্টেরিয়ামের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, গবলারদের মাথা মিসেস কুল্টার সহকারী বানানোর অছিলায় তাঁকে নজরবন্দি রাখতে চাইছেন। সুযোগ বুঝে পালাল সে, উঠল যাযাবর জিপসিদের ডেরায়। সেখানে তার পিতামাতার আসল পরিচয় জেনে অবশ্য লাইরার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল— যাঁকে সে এত দিন কাকা বলে ডেকেছে, সেই লর্ড অ্যাজ়রিয়েল তার বাবা, আর কুচক্রী মিসেস কুল্টার তার মা!
এ ভাবেই এগোয় ‘নর্দার্ন লাইটস’— ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ফিলিপ পুলম্যানের ‘এপিক ফ্যান্টাসি’ উপন্যাস। বইটির দু’টি সিকুয়েল— ‘দ্য সাটল নাইফ’ (১৯৯৭) আর ‘দ্য অ্যাম্বার স্পাইগ্লাস’ (২০০০)— পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়, এবং তিনটি উপন্যাস একত্রে ‘হিজ় ডার্ক মেটিরিয়ালস’ নামে পরিচিতি পায় (সঙ্গের ছবিতে, এইচবিও-র ‘হিজ় ডার্ক মেটিরিয়ালস’ সিরিজ়ের পোস্টার)। ফ্যান্টাসির ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সাহিত্যকর্ম বলে গণ্য হওয়া এই ট্রিলজিতে পুলম্যান সংগঠিত ধর্ম, বিশেষ করে ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ানিটির ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। চার্চের গোঁড়ামি ও ভণ্ডামিকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন। তাঁর কল্পিত ম্যাজিস্টেরিয়াম মধ্যযুগীয় ভ্যাটিকানের রূপক— এক স্বার্থান্বেষী, ক্ষমতালোভী সংগঠন, যা কখনও বিধিনিষেধের প্রাচীর তুলে, কখনও পাপের ভয় দেখিয়ে জনতাকে বশে রাখে, এবং লর্ড অ্যাজ়রিয়েলের মতো প্রতিবাদীদের ‘ধর্মদ্রোহী’ চিহ্নিত করে পথ থেকে সরিয়ে দিতে চায়। তার ঈশ্বর বা ‘অথরিটি’ লোকচক্ষুর আড়ালে অবস্থানকারী এক স্বৈরাচারী সত্তা, যে গোটা ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখে।
লাইরার জগৎ যেন আমাদেরই চেনা দুনিয়ারই সামান্য পরিবর্তিত প্রতিবিম্ব। সেখানকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের মতো উন্নত নয় (তার আকাশে এরোপ্লেনের বদলে ভেসে বেড়ায় বিশাল বিশাল যাত্রীবাহী গ্যাস বেলুন), তবে সেই অভাব অনেকটাই পুষিয়ে দেয় ম্যাজিক। লাইরার অ্যালেথিয়োমিটার যেমন এক আশ্চর্য জাদুযন্ত্র। কম্পাস যেমন ব্যবহারকারীকে সর্বদা নির্ভুল ভাবে উত্তরের অভিমুখ নির্দেশ করে, তেমনই অ্যালেথিয়োমিটার ব্যবহারকারীর মনে উদ্রেক হওয়া প্রশ্নের সঠিক উত্তর আভাস ও ইঙ্গিতে দেয়। সেই জগতের আর এক বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো ‘ডিমন’দের উপস্থিতি। ডিমন হলো মানুষের আত্মার বাহ্যিক প্রতিরূপ— সে কোনও না কোনও পশুর দেহ ধারণ করে, এবং তার মানবরূপের সঙ্গে অতিলৌকিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। ডিমনরা মানুষের মতোই অনুভূতিপ্রবণ, ভাবনা-চিন্তা করতে, কথা বলতে সক্ষম। লাইরার ডিমন প্যান্টালেইমন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ছায়াসঙ্গী, সে লাইরাকে সব সময়ে সৎ পরামর্শ দিতে থাকে, কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে সর্বতো ভাবে সহায়তা করে।
‘হিজ় ডার্ক মেটিরিয়ালস’ শব্দবন্ধটি পুলম্যান ধার নিয়েছিলেন জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ মহাকাব্য থেকে— সেই মহাকাব্য, যা মানবতার পতনকে বর্ণনা করে বাইবেলের ‘জেনেসিস’ অধ্যায়ের অনুসরণে। গল্পটা কম-বেশি সবারই জানা। সৃষ্টির আদিলগ্নে ‘গার্ডেন অফ ইডেন’-এ বসবাস করতেন অ্যাডাম এবং ইভ। একদিন সাপরূপী শয়তানের প্ররোচনায় ইভ নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খান, এবং অ্যাডামকেও খাওয়ান। ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করার শাস্তিস্বরূপ পবিত্র বাগান থেকে বিতাড়িত হন তাঁরা, অন্যান্য মরণশীল প্রাণীদের সঙ্গে পৃথিবীতে ঠাঁই হয় আদি মানব ও মানবীর। তার পর থেকে প্রত্যেক মানবসন্তানকে ‘অরিজিনাল সিন’-এর বোঝা বইতে হয়, প্রত্যক্ষ কোনও অপরাধ না করেও ঈশ্বরের সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়।
মিল্টনের এই রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে নস্যাৎ করেছেন পুলম্যান, পরিবর্তে গ্রহণ করেছেন প্রাক্-রোম্যান্টিক যুগের কবি উইলিয়াম ব্লেকের উদারবাদী ধর্মচেতনাকে। ব্লেক বিশ্বাস করতেন—‘এভরিথিং দ্যাট লিভস ইজ় হোলি’, মানবতার পতন কোনও অভিশাপ নয়, বরং সৃষ্টিচক্রেরই এক পর্যায়, পুনরায় উত্তরণের সোপান। ঈশ্বর কোনও উপাসনালয়ের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন, মানুষের অন্তরে, চার পাশে সদা বিরাজমান তিনি, এবং ভালো ও মন্দ, ‘ইনোসেন্স’ ও ‘এক্সপিরিয়েন্স’-এর দ্বন্দ্ব অনুধাবনের মাধ্যমেই তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি সম্ভব। এই বার্তা তাঁর কবিতায় বারবার উঠে এসেছে। পুলম্যানের সাহিত্যকর্মের মূল নির্যাসও এটাই।
অধ্যাপক, সাহিত্যিক ও নিষ্ঠাবান ক্রিশ্চান অ্যাপোলজিস্ট সি এস লিউইসের বিখ্যাত ফ্যান্টাসি সিরিজ় ‘ক্রনিকলস অফ নার্নিয়া’কে প্রতিস্পর্ধা জানানোর আকাঙ্ক্ষা ‘হিজ় ডার্ক মেটিরিয়ালস’ রচনায় প্রেরণা জুগিয়েছিল, এ কথা পুলম্যান একাধিকবার স্বীকার করেছেন। লিউইসের সর্বাঙ্গসুন্দর তাত্ত্বিক খ্রিস্ট ধর্ম যে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দুর্নীতিপরায়ণ, অত্যাচারী ধর্মতন্ত্র হয়ে উঠতে বাধ্য— এই সত্যকে পাঠকের সামনে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। নার্নিয়ার সর্বময় কর্তা আসলানকে লিউইস এঁকেছিলেন পরিত্রাতা যিশুর আদলে। এর ঠিক বিপ্রতীপে অবস্থান করে পুলম্যানের অথরিটি, সে মানুষের সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে উদাসীন, অহংমদমত্ত একনায়ক (ট্রিলজির অন্তিমে বোঝা যায়, সে নিছকই এক দেবদূত, যে ভ্রমবশত নিজেকে ঈশ্বর ভাবত)। আসলান ও তাঁর অনুগামী পেভেন্সি ভাইবোনেদের রাজত্বকাল নার্নিয়ার বাসিন্দাদের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিল, কিন্তু অথরিটি-নিযুক্ত ম্যাজিস্টেরিয়াম শাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের উপর যথেচ্ছ দমন-পীড়ন চালাতে। অল্প কথায় বললে, লিউইসের খ্রিস্ট ধর্ম প্রেম, আত্মত্যাগ ও সৌভ্রাতৃত্বের জয়গান, আর পুলম্যানের খ্রিস্ট ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার নগ্ন আস্ফালন!
নারীচরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও পুলম্যানের মনোভাব ছিল তাঁর পূর্বসূরির সম্পূর্ণ বিপরীত। ক্যাথলিক চার্চ যুগ যুগ ধরে আদি পাপের দায় নারীর উপর চাপিয়েছে, তাকে পুরুষের অনুগত, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকার নিদান দিয়েছে। ততটা কট্টরপন্থী না হলেও লিউইস ছিলেন প্রচলিত ধ্যানধারণারই সমর্থক, তাই নার্নিয়ার আখ্যানে মেয়েদের পার্শ্বচরিত্র করেই দায় সেরেছেন। তার উপর রয়েছে পক্ষপাত। ‘ক্রনিকলস অফ নার্নিয়া’র শেষ বই ‘দ্য লাস্ট ব্যাটল’-এ আমরা দেখি, লুসি আজীবন আসলানের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার পুরস্কারস্বরূপ স্বর্গলাভ করছে, কিন্তু সুজ়ান নিজের নারীত্বকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাওয়ার দোষে স্বর্গ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখানেই সচেতন ভাবে ছক ভেঙেছেন পুলম্যান— ‘হিজ় ডার্ক মেটিরিয়ালস’-এর মুখ্য চরিত্র বানিয়েছেন কিশোরীবেলার দোরগোড়ায় দাঁড়ানো এক অনাথাকে, এবং তাকে এমন সমস্ত গুণে গুণান্বিত করেছেন, যা কিছু কাল আগেও ধর্মযাজকদের কপালে ভ্রূকুটি এনে দিত। লাইরা কৌতূহলী, স্বাধীনচেতা, দুঃসাহসী, প্রয়োজনে গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারে, কোনও কিছু বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়াটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। ম্যাজিস্টেরিয়ামের চোখে সে বিপজ্জনক, দ্বিতীয় ইভ, কিন্তু মুক্তচিন্তার অধিকারী পাঠকের কাছে তার পরিচয় বীরাঙ্গনার, নব যুগের দিশারীর।
পাশ্চাত্য খ্রিস্টান সমাজের একটা বড় অংশ ‘হিজ় ডার্ক মেটিরিয়ালস’কে ব্রাত্য করে রেখেছে, অসহিষ্ণু ধর্মান্ধরা নিরন্তর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-ব্যক্তিগত আক্রমণ শানিয়েছে ফিলিপ পুলম্যানের উদ্দেশে। তবে নির্মোহ বিচারে, এই ট্রিলজি অগণিত কিশোর-কিশোরীর হৃদয়ে ‘সেন্স অফ ওয়ান্ডার’ জাগিয়েছে। আর একই সঙ্গে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, এই বলিষ্ঠ উচ্চারণ দ্বারা আধুনিকমনস্ক ফ্যান্টাসিপ্রেমীদের আস্থা অর্জন করেছেন সদ্য আশি পূর্ণ করা কাহিনিলেখক ফিলিপ পুলম্যান।
