প্রেম ছিল, ছিল আকুলতা। ছিল মনের কথা জানানোর তাগিদও। তবু সব ভালোবাসার পরিণতি মিলনে হয় না। কিছু অনুভূতি থেকে যায় অপূর্ণ। কিছু চিঠি হয়ে ওঠে না পাওয়ার সাক্ষী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস চোখের বালির বিনোদিনীর জীবনেও প্রেম, আকাঙ্ক্ষা আর অপূর্ণতার এমনই জটিল সমীকরণ। সেই সাহিত্যিক আবহ থেকেই এবারের দুর্গাপূজায় ঝরাপাতা থিমের আয়োজন। এখানে চিঠি কেবল মনের কথা জানানোর মাধ্যম নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি ও অপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক। প্রতিমার গায়ে সাজানো চিঠিতে প্রেম, বিরহ আর না বলা কথার গল্প শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা।
রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে বিনোদিনীর জীবনে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঞ্চনা, ঈর্ষা ও আত্মমর্যাদার দ্বন্দ্ব। মহেন্দ্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক জটিলতায় জড়ায়। অন্যদিকে বিহারীর প্রতি তার অনুভূতিও কাঙ্ক্ষিত পরিণতি পায় না। শেষ পর্যন্ত বিনোদিনীর জীবনে পূর্ণতার বদলে প্রাধান্য পায় বিচ্ছেদ ও অপূর্ণতার বোধ। সেই না পাওয়ার অনুভূতিকে সামনে রেখেই ‘ঝরাপাতা’ থিমে চিঠির ব্যবহার। যে কথা মুখে বলা যায় না, যে সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না, তার স্মৃতি যেন থেকে যায় চিঠির পাতায়। ঝরে যাওয়া পাতার মতোই সেগুলো বহন করে অতীতের গল্প।
এমনই শিল্পভাবনার দেখা মিলেছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা এলাকার ঈশ্বরচন্দ্র সরকারদের বাড়ির দুর্গামণ্ডপে। জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে আয়োজিত পারিবারিক এই পূজায় সাহিত্যনির্ভর থিমের পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ধর্মীয় রীতি ও ঐতিহ্য।
চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে জোয়ারার দিকে এগিয়ে পশ্চিমে প্রায় ১০ মিনিটের পথ। স্থানীয়ভাবে পরিচিত পাগলাগারদ এলাকার কাছেই ঈশ্বরচন্দ্র সরকারের বাড়ি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে এখনো জমিদারবাড়ির পুরোনো পরিবেশের ছাপ রয়েছে। এই বাড়িতেই ১৯২১ সালে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র সরকার। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বড় ছেলে নীলরতন সরকারের জন্ম উপলক্ষে পরিবারের এক মানত পূরণ করতে এই পূজার আয়োজন শুরু হয়।
প্রথম তিন বছর প্রতিমা পূজা হওয়ার পর তা ঘট পূজায় রূপ নেয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, পূর্বপুরুষের নির্দেশনা অনুযায়ী শতবর্ষ পূর্তির পর ২০২২ সালে আবার প্রতিমা পূজা শুরু করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় জমিদারবাড়ির উঠানে প্রতিবছর আয়োজন করা হচ্ছে দুর্গোৎসব। প্রায় ছয় মাস আগে থেকে শুরু হয় প্রস্তুতি। পারিবারিক উদ্যোগে আয়োজিত এই পূজায় চাঁদা সংগ্রহ করা হয় না বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
১৯৭১ সালে বন্ধ, তবু থামেনি পূজা
পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই বাড়ির পূজা বন্ধ করে দেয়। তখন পরিবারের অনেক সদস্য ভারতে চলে যান। তবে হরিরঞ্জন সরকার গ্রামেই থেকে যান। পরিবারের দাবি, সেই সময় নিরাপত্তার কারণে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে ঘরের ভেতরে দেবীর পূজা অব্যাহত রাখেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধর্মীয় রীতি ধরে রাখার এই স্মৃতি তাদের কাছে পারিবারিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জানা গেছে, ঈশ্বরচন্দ্র সরকারের চার ছেলে ছিলেন নীলরতন সরকার, হরিরঞ্জন সরকার, নিখিলরঞ্জন সরকার ও সুবোধরঞ্জন সরকার। তাদের মধ্যে সুবোধরঞ্জন সরকার বর্তমানে কলকাতায় বসবাস করেন। দূরে থাকলেও তিনি নিয়মিত পূজার খোঁজখবর রাখেন। তার ছেলে পশ্চিমবঙ্গে আইএএস কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
চাঁদা নয়, পরিবারের উদ্যোগেই আয়োজন
পরিবারের সদস্য শুভাশীষ সরকার কালবেলাকে বলেন, আমাদের প্রজন্ম এখনো ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। আমরা ঈশ্বরচন্দ্র সরকারের নাতি। আমরা দুই ভাই দেবাশীষ সরকার ও আমি শুভাশীষ সরকার।
পূজার আয়োজন সম্পর্কে তিনি বলেন, ঝরাপাতা থিমটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখের বালি উপন্যাসের আলোকে করা হয়েছে। বিনোদিনীর প্রেম, বিচ্ছেদ কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিলন হয়নি। সেই ভাবনা থেকেই চিঠিগুলো প্রতিমার গায়ে দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহ্য ধরে রাখার বিষয়ে শুভাশীষ সরকার বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের পূজায় উচ্ছৃঙ্খল নৃত্য কিংবা ডিজে বাজানো হয় না। আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করে আসছি। এখানে সাত্ত্বিকভাবে পূজা হয়। ধুনুচি নাচের আয়োজন রয়েছে। আমাদের ছেলেরাই এতে অংশ নেন। এটি সম্পূর্ণ পারিবারিক পূজা। চাঁদা নেওয়া হয় না, কারও সহযোগিতাও নেওয়া হয় না।
তবে এবারের পূজায় চন্দনাইশের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দিন ২০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন বলে জানান তিনি। এছাড়া ৬০০ কেজি চালও পাওয়া গেছে। পূজার আয়োজনের অংশ হিসেবে প্রজেক্টরের মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
পশুবলি থেকে সাদাবলি
পরিবারের সদস্য দেবাশীষ সরকার জানান, তাদের পূর্বপুরুষের সময়ে পূজায় ছাগল বলির প্রচলন ছিল। পরে পরিবারের প্রবীণ নারীরা সেই প্রথা বন্ধ করে দেন। পশুবলির পরিবর্তে চালকুমড়া, তরমুজ, আখ, কলা বা শসা উৎসর্গ করার রীতি চালু করা হয়, যা পরিবারে ‘সাদা বলি’ নামে পরিচিত।
দেবাশীষ সরকার বলেন, আমার ঠাকুরদা বলে গিয়েছিলেন, ১০০ বছর পূর্ণ হলে পূজা প্রতিমা দিয়ে চালিয়ে যেতে হবে। সেই নির্দেশনা মেনেই আমরা প্রতিমা পূজা শুরু করেছি। বাবা আমাদের এই ঐতিহ্যের কথা শিখিয়ে গেছেন। আমরা সেভাবেই পূজা চালিয়ে যাচ্ছি।
ভক্তদের সমাগম, শেষ দিনের প্রস্তুতি
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি আশপাশের মুহাম্মদপুর ও বড়ুয়াপাড়া থেকেও প্রতিদিন ভক্তরা পূজায় অংশ নেন। প্রতিদিন আনুমানিক দেড় হাজার মানুষের সমাগম হয় বলে দাবি আয়োজকদের। নবমী ও শেষ দিনের আয়োজনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন দেবাশীষ সরকার।
ষষ্ঠী থেকে সাত্ত্বিক রীতিতে পূজা, নিরামিষ আহার এবং ধুনুচি নাচের আয়োজন করা হয়েছে। দশমীর সকালে অঞ্জলি ও চৌতিশা পাঠের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভক্তদের জলযোগ ও খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে। দুপুরে আমিষ ভোজনের আয়োজনের পর বিকেল চারটার পর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই পূজা। পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া শতবর্ষী ঐতিহ্য ও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের আলোকে প্রেম, বিরহ ও অপূর্ণতার শিল্পিত প্রকাশ পেয়েছে মণ্ডপটিতে। ঝরাপাতার চিঠিগুলো সেই না বলা কথার স্মারক হয়ে উঠেছে।
