বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আন্তর্জাতিক কার্ডসহ অনুমোদিত পরিশোধ ব্যবস্থায় পণ্য ও সেবা বিক্রির অর্থের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রায় নিজেদের হিসাবে রাখতে পারবে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিপণি-বিতান, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বাকি ৮৫ শতাংশ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে টাকায় ভাঙাতে হবে। এসব বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধ বৈদেশিক দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে পারবে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-২ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দেশের সব অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংককে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি ক্রেতা ও পর্যটকদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক কার্ডে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হিসাবে সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিদেশি দর্শনার্থীদের আন্তর্জাতিকভাবে ইস্যু করা কার্ড এবং অন্যান্য অনুমোদিত পরিশোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য ও সেবা কেনাবেচাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে এ ধরনের লেনদেন থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে রাখা যাবে।
যদিও এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক কার্ড বা অন্যান্য অনুমোদিত পরিশোধ ব্যবস্থায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া মোট বৈদেশিক মুদ্রার ১৫ শতাংশের বেশি নিজেদের হিসাবে রাখতে পারবে না। অর্থাৎ ১০০ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হলে সর্বোচ্চ ১৫ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে রাখা যাবে। অবশিষ্ট ৮৫ টাকার সমপরিমাণ অর্থ টাকায় ভাঙাতে হবে।
বৈদেশিক দায় মেটাতে ব্যবহার
নতুন নিয়মে হিসাবে রাখা বৈদেশিক মুদ্রা ইচ্ছামতো খরচ করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব অর্থ চলতি হিসাবের আওতাভুক্ত বৈধ বৈদেশিক মুদ্রার দায় পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে করা অনুমোদিত পরিশোধও রয়েছে।
যদিও এ ধরনের লেনদেনে প্রযোজ্য কর ও মূল্য সংযোজন কর যথাযথভাবে কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা রাখার সুযোগ দেওয়া হলেও কর ও অন্যান্য সরকারি পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় থাকছে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক কার্ড এবং অন্যান্য অনুমোদিত পরিশোধ ব্যবস্থা গ্রহণের উপযুক্ত ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও লেনদেনের বিষয়ে যথাযথ যাচাই করতে হবে।
মানতে হবে অর্থপাচার প্রতিরোধের নিয়ম
বিদেশি মুদ্রা সংরক্ষণের এ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি অর্থপাচার ও অবৈধ অর্থের প্রবাহ ঠেকাতেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের পরিচিতি যাচাই, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন দেওয়ার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে লেনদেনের প্রকৃতি, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈধতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় যাচাই করতে হবে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও প্রযোজ্য থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, বিপণি-বিতান, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ সুবিধার আওতায় আসবে। অর্থাৎ বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক কার্ড বা অনুমোদিত অন্য কোনো পরিশোধ ব্যবস্থায় পণ্য ও সেবা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সুবিধাটি নিতে পারবে।
পর্যটন ও সেবাখাতে লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে কেনাকাটা ও সেবা গ্রহণ উৎসাহিত করতেই মূলত এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতদিন আন্তর্জাতিক কার্ডে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার অর্থের বড় অংশ স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরের প্রয়োজন হতো। নতুন ব্যবস্থায় এর একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণের সুযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা সহজ হবে।
বিশেষ করে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় আন্তর্জাতিক কার্ডে লেনদেন বাড়লে তাদের বৈধ বৈদেশিক দায় পরিশোধে সংরক্ষিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিদেশি পর্যটকদের জন্য কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কিছুটা নমনীয়তা আসবে।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় বিভিন্ন বৈধ লেনদেনের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ধারাবাহিকতায় এবার বিদেশি দর্শনার্থীদের কাছ থেকে পণ্য ও সেবা বিক্রির অর্থের একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় রাখার সুযোগ দেওয়া হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক একই সঙ্গে অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জানাতে নির্দেশ দিয়েছে।
