ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত একগুচ্ছ নতুন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের মনোভাব তুলনামূলকভাবে নমনীয় হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন তিনি। এমনকি কিয়েভের নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে গত শুক্রবার রাতে এক নির্বাহী আদেশে তিনি এই সিদ্ধান্ত জানান। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থেই’ এসব নিষেধাজ্ঞার বড় একটি অংশ স্থগিত রাখা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটÑ উভয় দলের সম্মতিতে পাস হওয়া বিলে স্বয়ং ট্রাম্পই স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই আইনে রাশিয়ার অর্থনীতিকে ঘায়েল করতে দেশটির তেল-গ্যাস কেনা শীর্ষ দেশগুলোর (বিশেষ করে চীন ও ভারত) ওপর সর্বোচ্চ শতভাগ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল ট্রাম্পকে।
পাশাপাশি ভøাদিমির পুতিনসহ রাশিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এবং আগে থেকে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে ব্যবহার করা মস্কোর ‘ছায়া নৌবহরের’ ওপর কড়াকড়ির বিধান ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সেই বিধানগুলোর বড় অংশই আটকে দিলেন ট্রাম্প।
চলতি সপ্তাহেই রাশিয়ার ডিজেল কেনা নিয়ে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে নতুন করে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। আসছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি সামাল দিয়ে মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভ কমাতে চাইছেন ট্রাম্প। এই লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির এক বিতর্কিত উদ্যোগ নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়ার ডিজেল ক্রয় সরাসরি মস্কোর যুদ্ধ তহবিলে মার্কিন ডলার জোগানোর শামিল। একই সঙ্গে কিয়েভ অভিযোগ তোলে, ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহায়তা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ট্রাম্প ও জেলেনস্কি পরস্পরের ওপর একের পর এক বাক্যবাণ ছুড়তে থাকেন।
ট্রাম্প মন্তব্য করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের চেয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনা বা সমঝোতা করা ‘বেশি কঠিন’। জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সম্মেলনে গিয়ে ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে জেলেনস্কি বলেন, ‘আসল নেতাদের’ মাঝে থাকতে পেরে তার স্বস্তি লাগছে।
এর কয়েক দিন পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই তেল রপ্তানি নির্বিঘœ করতে একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইউক্রেনের দাবি, ট্রাম্পের ঘোষণার পরও রাশিয়া ইউক্রেনের তেল অবকাঠামোতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এর তিন দিন পর কিয়েভও ফের রাশিয়ার তেল শোধনাগারে পাল্টা হামলা চালায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প ইউক্রেনীয় হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে বর্ণনা করলেও জেলেনস্কির সাফ জবাব, তিনি শুধু নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষা করছেন।
উত্তেজনা আরও চরম রূপ নেয় যখন জেলেনস্কি অভিযোগ তোলেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের গতি যুক্তরাষ্ট্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কমিয়ে দিয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও বন্ধ রেখেছে।
কিয়েভের ভাষ্য, ইন্টারনেটের গতি ধীর হয়ে যাওয়ার সুযোগে কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই ইউক্রেনে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প।
এদিকে কার্যকর হওয়ার আগমুহূর্তে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আটকে দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ক্ষোভের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
ভার্জিনিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ডন বায়ার এক্সে লেখেন, পুতিনের কাছে ট্রাম্পের এই নতিস্বীকার ইউক্রেনীয় অংশীদারদের সঙ্গে নতুন বিশ্বাসঘাতকতা এবং আগ্রাসী রাশিয়াকে শাস্তির মুখে ফেলার জন্য পাস করা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো, যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতো। মূলত মার্কিন-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা ইতিমধ্যেই বর্ধিত জীবনযাত্রার খরচের মুখোমুখি হচ্ছেন।
