সাইবার হামলার আশঙ্কায় সম্প্রতি সাময়িক ভাবে দুনিয়া জুড়ে বন্ধ রাখতে হয় কয়েক হাজার ওয়েবসাইট। পিএইচপি-তে ধরা পড়ে ত্রুটি। কী এই পিএইচপি?
০১ / ১৬
সাইবার হামলার আতঙ্কে তটস্থ গোটা বিশ্ব। সাময়িক ভাবে অসংখ্য ওয়েবসাইট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় দুনিয়ার তাবড় শক্তিশালী দেশগুলির সরকার। পাশাপাশি, বিশেষ সতর্কতা জারি করতেও দেখা গিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশ কিছু রাষ্ট্রকে। পরে ‘আপডেট’ পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও হ্যাকারদের থেকে কতটা সুরক্ষিত ইন্টারনেট? বিশেষজ্ঞ মহলে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সেই প্রশ্ন।
০২ / ১৬
চলতি বছরের ২১ অক্টোবর ব্যাপক পরিসরে সাইবার হামলার আশঙ্কা করে বিশেষ সতর্কতা জারি করে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দফতর। শুধু তা-ই নয়, হ্যাকারদের হাত থেকে বাঁচতে তড়িঘড়ি ওয়েবসাইট বন্ধ করতে বলে তারা। এই সতর্কবার্তা প্রকাশ্যে আসতেই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিবৃতি দেয় জাপান ও কানাডা এবং ইউরোপের একাধিক দেশ।
০৩ / ১৬
সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়েবসাইট তৈরি ও ব্যবহারে বহুল ব্যবহৃত ‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ পিএইচপি-তে ত্রুটি ধরা পড়ায় ওই সতর্কতা জারি করে মার্কিন প্রশাসন। বিশ্লেষকদের দাবি, এর জেরে কোনও পাসওয়ার্ড ছাড়াই যে কোনও ওয়েবসাইটে ঢুকে পড়ার সুযোগ পেতে পারে হ্যাকারদের গ্যাং। ফলে, ফাঁস হতে পারে সেখানকার যাবতীয় তথ্য।
০৪ / ১৬
এখন প্রশ্ন হল, কী এই পিএইচপি? সহজ কথায় একে ওয়েবসাইট পরিচালনার ভাষা বলা যেতে পারে। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে বাজারে আসে এটি। তখন এর নাম ছিল ‘পার্সোনাল হোম পেজ’। এখন অবশ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের কাছে পিএইচপি হল ‘হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর’। কী ভাবে এটি ব্যবহার হয়ে থাকে, আনন্দবাজার ডট কম-এর এই প্রতিবেদনে রইল তার বিস্তারিত বিবরণ।
০৫ / ১৬
উল্লেখ্য, ইন্টারনেট চালু থাকলে যে কোনও গ্রাহক সেখান থেকে নিজের পছন্দ মতো তথ্য পেতে পারেন। মজার বিষয় হল, ইন্টারনেটের একটি নিজস্ব ভাষা রয়েছে। প্রযুক্তিবিদদের কথায়, সেটাই পরিচালনা করে থাকে পিএইচপি। বিপদের জায়গাটি হল, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট পিএইচপি প্রযুক্তিতে তৈরি।
০৬ / ১৬
একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টিকে আরও ভাল ভাবে বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, কোনও ব্যক্তি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছেন। মেনুকার্ডে থাকা খাবারের মধ্যে পছন্দের পদ বেছে নিয়ে বেয়ারার মাধ্যমে অর্ডার দিতে হবে তাঁকে। এর পর ওই বেয়ারাই সেই খাবার হাজির করবেন তাঁর সামনে। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে ঠিক এই কাজটাই করে থাকে পিএইচপি।
০৭ / ১৬
অর্থাৎ, কোনও গ্রাহক ইন্টারনেটের সার্চ ইঞ্জিনে (যেমন গুগ্ল) কিছু লিখে কোনও তথ্য জানতে চাইলে, তাঁর ভাষাকে সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের ভাষায় পরিণত করে পিএইচপি। এর পর তথ্যভান্ডার বা ডেটা সেন্টার থেকে ওই তথ্য খুঁজে এনে নিজের ভাষাতেই উত্তর দেয় তারা। স্ক্রিনে ফুটে ওঠার আগে সেটি বদলে যায় আমজনতার কথ্য ভাষায়। বছরের পর বছর ধরে এই কাজ করে আসছে পিএইচপি।
০৮ / ১৬
কিন্তু, সম্প্রতি এই ‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে’ ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স)। মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগ্ল মালিকানাধীন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘উইজ়’ জানিয়েছে, নিজের উদ্যোগে সেই ত্রুটি শনাক্ত করেছে তারা। এই কাজে গুগ্লের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘জেমিনি ৪ আর্গন’ ও ‘জিপিটি-৫.৬ সোল’ মডেলের সাহায্য নেয় তারা।
০৯ / ১৬
একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি কৃত্রিম মেধা সংস্থা ‘ওপেনএআই’কেও। তাদের দাবি, বহু ওয়েবসাইটের নকশা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল পিএইচপি। সেখানেও বড়সড় ত্রুটি ধরা পড়েছে। ফলে, জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে ওয়েবসাইট নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দেয় ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম-সহ বিভিন্ন দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
১০ / ১৬
পিএইচপি-র ত্রুটির খবর প্রকাশ্যে আসায় সাইবার হামলার আশঙ্কায় বিঘ্ন ঘটে ব্যাঙ্ক, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের কাজকর্মে। এর প্রভাব পড়ে ভারতেও। এ দেশের কয়েকটি সংস্থা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বেশ কিছু ওয়েবসাইট ‘অফলাইন’ করে রেখেছিল। পরে অবশ্য স্বাভাবিক হয় পরিস্থিতি।
১১ / ১৬
‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজে’র ত্রুটি সংশোধন করতে ২১ অক্টোবরই সংশোধিত সংস্করণ বাজারে আনে পিএইচপি। সিস্টেম আপডেটের মাধ্যমে যেটি ইনস্টল করায় এ বারের মতো বিপদ এড়ানো গিয়েছে। এই ঘটনায় কৃত্রিম মেধার পারফরম্যান্সে বেজায় খুশি প্রযুক্তিবিদদের একাংশ। যদিও এআই-এর অন্যান্য বিপদ সম্পর্কে দুনিয়াকে সতর্ক করেছে মার্কিন টেক জায়ান্ট ‘অ্যানথ্রপিক’।
১২ / ১৬
‘অ্যানথ্রপিক’-এর কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তির নাম ক্লড। সংস্থাটির দাবি, সেটি ব্যবহার করে নিখুঁত নিশানায় সৌদি আরবের উপর লাগাতার হামলা চালাচ্ছে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। এআই-এর দৌলতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খুঁটিনাটি হাতিয়ে নিয়েছে তারা। ফলে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করা রীতিমতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৩ / ১৬
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় বিশেষ কমান্ডো অপারেশন চালায় মার্কিন ফৌজ। রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় তারা। এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় ক্লড। কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তির সাহায্যে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর সঠিক অবস্থান আগে থেকেই বুঝে নিয়েছিল আমেরিকার সেনা।
১৪ / ১৬
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা। সংঘর্ষের প্রথম দিনই তেহরানের সুপ্রিম লিডার তথা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে উড়িয়ে দেয় মার্কিন ও ইহুদিদের যৌথ বাহিনী। প্রাণ হারান তাঁর সঙ্গে থাকা একাধিক শীর্ষ সেনা কমান্ডারও। সেই অপারেশনেও ক্লড ব্যবহার হয়েছিল বলে সূত্র মারফৎ মিলেছে খবর।
১৫ / ১৬
অন্য দিকে, সম্প্রতি ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের (এসবিআই) ৩,৮৯৭ জন গ্রাহকের তথ্য ফাঁস করে সাইবার অপরাধীদের গ্যাং। সেই তথ্য ডার্ক ওয়েবে প্রকাশ করে তারা। গ্রাহকদের মোবাইল নম্বর, জন্মতারিখ, নাম, লিঙ্ক, ই-মেল আইডি এবং বাড়ির ঠিকানা হাতাতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। এতে যদিও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে বিবৃতি দিয়েছে এসবিআই।
তার পরেও আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ, ‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’-ই যদি ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়, তা হলে কতক্ষণ আর সাইবার অপরাধীদের থেকে বাঁচানো যাবে আমজনতা বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য? এই ধরনের ত্রুটি চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে এআই কতটা বিশ্বাসযোগ্য? যেহেতু কৃত্রিম মেধার ঢালাও ব্যবহার করছে হুথিরা, তাই এমন নানা প্রশ্ন উঠছেই।
সব ছবি: সংগৃহীত।
