Published on
:
3 min read
শুভময় মৈত্র
গত মে-জুন মাস নাগাদ নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র আন্দোলন শুরু হয়। দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সামাজিক মাধ্যম থেকে জন্মানো একটি আন্দোলন রাস্তায় নেমেছিল, আর তারই চাপে শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়— এই অতিসরলীকরণ মেনে নেওয়া মুশকিল। একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ মানেই যে দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার সব সর্দিকাশি সেরে গেল, তেমনটা নয়। কিন্তু আন্দোলনের চাপে ক্ষমতাসীন সরকারকে এক পা পিছিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যে নিতে হলো, এই বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এর আগে কৃষক আন্দোলনের সময়ও পিছু হঠতে হয় বিজেপিকে, যদিও তার পরে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জোটসঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখে বিজেপি। এর পর বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে আবার ভালো ফল করতে থাকে তারা।
আন্দোলন ২.০-তে আরশোলারা ফিরেছে নির্বাচনী সংস্কার সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে। এসআইআর-কে কেন্দ্র করে তাদের নতুন আন্দোলন। ২ অক্টোবর মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে প্রতিবাদের পর ১০ তারিখে দিল্লিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। এ কথা মাথায় রাখতে হবে যে বিরোধী দলগুলির একাধিক সাংসদ ২০২৪-এর পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতায় মতাদর্শগত রাজনীতি শিকেয় তুলে বিজেপি-র আসন বৃদ্ধির কাজে সচেষ্ট, ফলে বিরোধী ঐক্যের নামগন্ধ ছিল না। এখন আরশোলাদের দৌলতে পরিস্থিতি বদলেছে। বিশেষ করে বামপন্থী সংগঠনগুলির যুব নেতৃত্ব পথে নেমেছে। রাহুল গান্ধী পরিচালিত সাংবাদিক সম্মেলনে দেখা গেছে নেহা বোরা এবং ঐশী ঘোষকে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের বিভিন্ন খণ্ডাংশ কিংবা আপ-এর মতো দল থেকে বিজেপি-র দিকে ডিগবাজি খাওয়ার ঝোঁক আপাতত স্তিমিত। উল্টে চিরাগ পাসোয়ান গোছের বিজেপি-র জোটসঙ্গীও বেসুরো গাইছেন। অর্থাৎ এই আন্দোলনের একটি সম্ভাব্য অনুসিদ্ধান্ত হলো, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ যে ভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছিল, সে গতি আপাতত মন্দ। সংবাদমাধ্যমের যে প্রতিবেদনের নিরিখে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে তার মধ্যে ৬ নং ফর্ম নিয়ে দেশের শীর্ষ আদালতের বক্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষিতে সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে সিজেপি। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর-এর নামে তালিকা থেকে যে বিপুল সংখ্যক জীবন্ত ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাতে গোটা দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপন্ন।
স্বাভাবিক ভাবেই এই অভিযোগ বিজেপি মানতে নারাজ। তাদের প্রচারের মূল ধারা হলো, রাজনৈতিক বিরোধী মানেই দেশদ্রোহী। সমাজমাধ্যমে এই ধরনের প্রচারে বিজেপি-র যে বিপুল ব্যাপ্তি দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষ করা গেছে, সেখানে কিছুটা হলেও এবার থাবা বসিয়েছে আরশোলারা। সিজেপি বিদেশ থেকে অর্থসাহায্য পেয়ে দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে চাইছে, এই ভাষ্যের প্রতিযুক্তিও উঠে আসছে বিভিন্ন পরিহাসে। রিলে দেখা যাচ্ছে রাস্তায় চা খেয়ে অনলাইনে বিদেশি রাষ্ট্রনায়ককে পয়সা দিতে বলছে আরশোলাদের প্রতিনিধি। অন্য দিকে শিক্ষামন্ত্রী বিদায়ের সময় এই জেন জ়ি-দের সঙ্গে বিজেপি এবং আরএসএস-এর শীর্ষ নেতৃত্ব কয়েকটি মিটিং করে ফেলায় পতঙ্গদের দেশ-বিরোধিতার তত্ত্ব যে কিছুটা তীক্ষ্ণতা হারিয়েছে, তা সহজবোধ্য।
আপাতত যে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, আরশোলাদের এই দ্বিতীয় আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী? রাজনীতিতে যেহেতু অনিশ্চয়তা অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, তাই এর উত্তর এখনই জানার কথা নয়। তবে দেশে অর্থনীতির অঙ্ক, সামাজিক ভারসাম্যের দর্শন এবং রাজনীতির রসায়ন যে সার্বিক উন্নয়নের দিকনির্দেশ করছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। তাই শিক্ষা বা কর্মসংস্থান নিয়ে কোনও আন্দোলন সাড়া জাগালে তা অস্বাভাবিক নয়। ধর্ম কিংবা পরিচয়সত্তার রাজনীতি বেশ কয়েক দশক ধরে ভারতের জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রেখেছে। সেই গোটা ব্যবস্থা পরিবর্তনের ভাষ্য পেশ করছে আরশোলারা। বিশেষ করে ভোটার তালিকায় বিপুল নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি যদি সংখ্যালঘু বা অনুপ্রবেশকারী তত্ত্বকে অতিক্রম করে ডানা মেলতে পারে, তখন বিরোধীদের আরও সোচ্চার হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
শেষে বলতেই হয়, ভারতের গণতন্ত্রকে নেপাল বা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করাটা ঠিক নয়। ভারতের আয়তন, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী কাঠামো আলাদা। একই সঙ্গে গণতন্ত্রের দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস রয়েছে। তাই বিরোধীদের অপেক্ষা করতে হবে সামনের বছর উত্তরপ্রদেশে সেমিফাইনাল আর ২০২৯-এর দিকে। তার আগে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও বিজেপির সরকার পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম, আর দেশের মানুষও নির্বাচনকে অস্বীকার করে কোনও ক্ষমতা বদল চাইবে না, নির্বাচন নিয়ে যতই প্রশ্ন উঠুক না কেন। আরশোলাদের জয়ে বা ভয়ে ইতিহাস না ভুললে সে উদাহরণগুলো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা সহজেই খুঁজে পাবেন।
লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতায় শিক্ষক। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
