১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান জয়পুরহাট সুগার মিলস এখন অস্তিত্ব সংকটে। বছরের পর বছর লোকসান, প্রায় ৭৩৯ থেকে ৮৫০ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ঋণ, আখের সংকট ও অবিক্রীত চিনির বোঝায় ধুঁকছে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি। একদিকে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার যন্ত্রাংশ, অন্যদিকে আধুনিকায়নের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। তবে আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়ায় চাষিদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ঋণের বোঝা কমিয়ে কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২১৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চিনিকলটির চত্বরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে রয়েছে ৩০০ টনেরও বেশি লোহার ভারী যন্ত্রাংশ, ট্রাক্টর, লোহা, ইস্পাত ও টিনসহ মূল্যবান মালামাল। বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকায় এসব সম্পদে মরিচা ধরেছে। নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ। এসব মালামাল উন্মুক্ত নিলামে বিক্রির দাবি জানিয়ে আসছেন শ্রমিক ও স্থানীয়রা। চিনিকলের বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে, কয়েকটি শাখার অকেজো মালামাল বিক্রির দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় বিক্রি সম্ভব হয়নি। নতুন কমিটির মাধ্যমে চলতি মাড়াই মৌসুম শেষে আবার দরপত্র আহ্বান করা হবে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই লোকসান গুনছে চিনিকলটি। অতিরিক্ত জনবল, আখের কম দাম, চাষিদের হয়রানি ও অব্যবস্থাপনায় ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সংকট আরও তীব্র হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৩৯ থেকে ৮৫০ কোটি টাকা।
চিনিকলটিতে বর্তমানে ২ হাজার ৩১০ টন চিনি অবিক্রীত রয়েছে। এর মধ্যে আগামী মাসে সেনাবাহিনীর জন্য ১ কেজির প্যাকেট প্রস্তুত রয়েছে ২ টন। এ ছাড়া ৭৬০ টন মোলাসেস মজুদ রয়েছে।
২০২৩-২৪ মৌসুম থেকে আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও চাষিদের পাওনা পরিশোধে হয়রানি বন্ধ হওয়ায় আখ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি কুইন্টাল আখের দাম মিলগেটে ৬৫১ টাকা এবং বাইরের ক্রয়কেন্দ্রে ৬৪৮ টাকা। প্রতি বিঘায় আখ বিক্রি করে কৃষক ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। খরচ বাদে নিট লাভ থাকছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। চলতি মৌসুমে ৩ হাজার ৭০০ একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. জায়েদ হোসেন বলেন, চিনিকল টিকিয়ে রাখতে শুধু চিনির ওপর নির্ভর করলে চলবে না, আধুনিকায়ন করতে হবে। এখানে পানির বোতলজাতকরণ কারখানা, চকলেট কারখানা ও হিমাগারের মতো প্রকল্প যুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাতেই লাভজনক করা সম্ভব। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারীকরণ না করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হবে।
চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ খবির উদ্দিন মোল্যা বলেন, ২০২১-২২ সালের সংকট কাটিয়ে গত মৌসুমে প্রায় দেড় মাস মাড়াই চালানো সম্ভব হয়েছে। আখের দাম কুইন্টালে ১৭ টাকা বাড়ানোয় চাষিদের মধ্যে আগ্রহ ফিরেছে। তবে পুরনো কারখানাটি টিকিয়ে রাখতে ব্যাপক আধুনিকায়ন ও পুঞ্জীভূত ঋণ মওকুফ জরুরি। সরকারের সহযোগিতা পেলে চিনিকলটি আবারও ঐতিহ্য ফিরে পাবে।
গত জুলাই ও সেপ্টেম্বরে পৃথক কর্মসূচি ও মতবিনিময়সভায় মিলের পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগানো, গ্র্যাচুইটি তহবিল চালু এবং কারখানা আধুনিকায়নের দাবিও তোলা হয়।
