গাজীপুরের টঙ্গীতে আবাসিক মাদ্রাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠাতা আলমাস হোসাইন। টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়া এলাকার ক্বরীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় শিশুটির পরিবারের আনা যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে অস্বীকার করেছেন তিনি। এটিকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবেও দেখছেন তিনি।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় প্রিন্সিপাল আলমাস হোসাইন দাবি করেছেন, মাদ্রাসার ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ১৫-১৬ জনের একটি দল পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনাটি সাজিয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেউদ্দিনকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যান্য শিক্ষক ও নিরাপত্তাকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। এছাড়া মাদ্রাসার অফিস কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
প্রিন্সিপাল আরও অভিযোগ করেছেন, হামলাকারীরা মাদ্রাসার তহবিল থেকে ১৭ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে।
ওই শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত মুসলেউদ্দিন মাদ্রাসাটির একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক যাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে প্রিন্সিপাল আলমাস হোসাইন দাবি করেন, মব সৃষ্টি করে সেদিন মাদ্রাসা থেকে ১৭ লাখ টাকা লুট করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি দুঢ়কণ্ঠে বলছি, আমি কোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত নই। আমি এই মাদ্রাসায় কোরআন পড়াচ্ছি ২০০৭ সাল থেকে।
তিনি বলেন, সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে। এরপর একটা স্টাপলার নিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছে। এতে অনেক রক্ত ঝরেছে। যৌন হয়রানির বিষয়ে যে শিশুটিকে নিয়ে কথা হচ্ছে সেই শিশুটি ক্লাস ওয়ানে পড়ে। সে দুই-আড়াই বছর ধরে এখানে পড়ে। আমাদের এখানে তার বাবা কোনোদিন আসেনি। এই প্রতিষ্ঠানে শিশুটি ওই ওস্তাদের কাছে ছোট থেকে পড়ছে। ওর মতো এ রকম ২০-২৫ জন শিশুটি এখানে পড়ে।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে তিনি বলেন, শিশুটির ওই অভিভাবক ফোন দিয়েছিলেন ভাইস প্রিন্সিপালকে। তিনি অসুস্থ, ঢাকার বাইরে আছেন।
সব বাচ্চা নাকি ভালো রেজাল্ট করেছে। এজন্য বাচ্চাটাকে ওই শিক্ষক বলেছেন, তোমাকে পাপ্পি দেব। সব বাচ্চাদের বলেছে, চকলেটও দিয়েছে। বলেছেন, ‘তোমাদের পাপ্পি দেব, তোমরা ভালো রেজাল্ট করবা। আমি তোমাদের অনেক বেশি আদর করবো।’ কথাটা ছিল এ রকম।
পরে শিশুটির মা ভাইস প্রিন্সিপালকে ফোন দিয়ে বলেছেন, ‘স্যার পাপ্পি দেওয়ার দরকার নাই। এমনি আদর করুক, ঠিক আছে।’
ওই ফোনের পর ভাইস প্রিন্সিপাল অভিযুক্ত শিক্ষককে ফোন দিয়ে বলেছেন যে, ‘আপনি কি এ রকম কথা বলেছেন?’ তখন ওই শিক্ষক বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমি তো সবাইকে বলেছি। আমি তো দিইনি কাউকে। বলেছি, তোমাদের আমি পাপ্পি দেব।’
তখন ভাইস প্রিন্সিপাল শিক্ষককে বলেছেন, ‘যেহেতু একজন অভিভাবক বলেছেন এটা নিয়ে। আপনি ২৫ জনকে বলেছেন। তার মধ্যে একজন যেহেতু এটাকে অন্যভাবে দেখেছেন, আপনি এটা করবেন না।’
আমাকে না জানিয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল বিষয়টি এভাবে সমাধান করেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ওই অভিভাবক পরবর্তীতে কি করেছেন? এখন প্রশ্ন হলো- ‘শিশুটি যদি এখানে কোনোভাবে হেজিটেশনে পড়তো অথবা যদি কোনো কারণে সে এটাকে ব্যাড-টাচ মনে করতো তাহলে অভিভাবক তো বাচ্চাকে পরদিন মাদ্রাসায় পাঠাতেন না। পরের দিন ওনার মেয়েকে তো পাঠিয়েছেন মাদ্রাসায়। এখন আমার প্রশ্ন জাতির কাছে, আমার শিক্ষক যদি খারাপ হয় তাহলে অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাকে আর পাঠাতেন না, যে এই মাদ্রাসায় আমি দেব না আমার বাচ্চাকে ব্যাট-টাচ করেছে বা চুমু দিয়েছি। কিন্তু উনি পরের দিন পাঠিয়েছেন। এটা আমাদের সিসিটিভি ফুটেজে আছে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে যেহেতু শিশুটি এসেছে তাহলে এখানে কোনো সমস্যা নেই। যেদিন ঘটনা ঘটেছে তার পরের দিন সেই শিশু আসছে। তার পরের দিনও এসেছে। সিসিটিভিতে শিশুটি খেলতেছে, ওস্তাদ পড়াচ্ছে, খুব আনন্দ করতেছে এখানে সিসিটিভিতে দেখাচ্ছে।’
প্রিন্সিপাল বলেন, ‘তিন-দিন, চার দিনের মাথায় ওই লোকটা (শিশুর বাবা) হঠাৎ করে গাড়ি নিয়ে কিছু লোকসহ যারা এই এলাকার না, আমরা চিনি না তাদের। আর উনাকেও আমরা চিনি না ঠিক। উনি কখনো আসেননি মাদ্রাসায়। ভর্তির সময় তার নানা আসতো, আর তার মেয়ে আসতো। উনি এসেই এখানে সবাইকে জিম্মি করে ফেলেছে। আমাদের কিছু টিচার এখানে ছিল, তাদেরকেও জিম্মি করে ফেললো।’
আলমাস হোসাইনের দাবি, ‘লোকজন হঠাৎ করে ঢুকে মানে একটা মব সৃষ্টি করে তারা আমার রুমে ঢুকে গেল। আমাকে খুব অকথ্য ভাষায় বলে, ওই শিক্ষককে নিয়ে আসো। আমি বলছি, ভাই আপনি কে? আমি তো আপনাকে চিনি না। বলে, আমাকে চিনবি তুই এখন। এইটা বলে এখানে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেললো।’
তিনি বলেন, ‘একটা ম্যাডাম এখানে ছিল তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। এখানে টাকা-পয়সা ছিল। আমাদের জমি কেনার টাকা ছিল। মাদ্রাসার নামে একটা জমি কেনার কথা হচ্ছিল। এজন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছি। সেটার আমাদের স্টেটমেন্ট আছে। সেই টাকা-পয়সা এখানে ছিল। এগুলো সবকিছু তছনছ করে ১৭ লাখ টাকা নিয়েছে।’
তিনি আরও দাবি করে বলেন, ‘পরবর্তীতে ওই শিক্ষক আসার পরে তাকে শুধু জিজ্ঞেস করেছে। শিক্ষক বলেছেন যে, হ্যাঁ, আমি চুমু দিতে চেয়েছিলাম। এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে মারধর করেছে। এলাকার মানুষ যেই এসেছে তাদেরকে ধমক দিয়ে স্টপ করে দিয়েছে। কাউকে কথা বলতে দেয়নি। পরে আমরা কোনো রকমে ওই শিক্ষককে মেডিকেলে পাঠিয়েছি।’
তিনি আরও দাবি করে বলেন, ‘এর মধ্যে আমরা একটা খবর পেয়েছি, এখানে চার-পাঁচ জন ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। তাদের ফেসবুক আইডিতে ঢুকে আমাকে অনেকে ছবি পাঠিয়েছে।
বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, মব করতে নয়: শিশুটির বাবা
যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন শিশুটির বাবা। তিনি দাবি করেছেন, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে তিনি মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন, কোনো ধরনের মব সৃষ্টি করতে নয়। তাঁর বিরুদ্ধে মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি।
শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন শিশুটির বাবা। এ সময় তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমার সন্তানের বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, মব সৃষ্টি করতে নয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আমি নাকি মব সৃষ্টি করেছি এবং ফ্ল্যাট দখল করতে গিয়েছি। আমি কেন মব সৃষ্টি করব? আমি তো একজন বাবা হিসেবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে গিয়েছিলাম।’
মাদ্রাসায় ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে শিশুটির বাবা বলেন, সেখানে একটি ছোট কাচের গ্লাস ভেঙেছিল। তবে সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছি, এর ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব।’
১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি জানান এই অভিভাবক। তিনি বলেন, ‘আমি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছি, সেটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যাচাই করা হোক। মাদ্রাসায় এত টাকা কীভাবে রাখা হয়, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেগুলোরও সুষ্ঠু তদন্ত হোক।’
ঘটনার বিষয়ে আমি তিন দিন আগেই অধ্যক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। আমি তাঁর কক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে এমন আচরণ করেছেন, যেন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতেই চান না।
শিশুটির বাবা বলেন, তিনি মাদ্রাসা বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নন। দ্বীনি শিক্ষার জন্যই মেয়েকে ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু সেখানে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমি ইসলাম বা প্রকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলছি না। যারা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করে এবং সত্য আড়াল করার চেষ্টা করে, আমি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি।’
এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানানোর পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ওই অভিভাবক। তিনি বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে আমি তিন দিন আগেই অধ্যক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। আমি তাঁর কক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে এমন আচরণ করেছেন, যেন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতেই চান না।’
নিজের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়ে শিশুটির বাবা বলেন, ‘আইন যদি মনে করে আমি অপরাধী, তাহলে আইন অনুযায়ী যে শাস্তি হবে, তা মেনে নেব। তবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার চাই।’
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, মৌখিকভাবে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
একজন বাবা হিসেবে মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনার অভিযোগ তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে উল্লেখ করে এই অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে যে ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, তা যদি আপনাদের নিজের সন্তানের সঙ্গে ঘটত, তাহলে আপনারা কি মেনে নিতে পারতেন? আমি আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাই।’
এদিকে শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে করা মামলায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়। এ ছাড়া মাদ্রাসায় ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পৃথক আরেকটি অভিযোগ দিয়েছে।
এ বিষয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, মৌখিকভাবে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
