থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে বিলাসবহুল ঘড়ি যেখানে সামাজিক মর্যাদার একটি পরিচিত প্রতীক, সেখানে বর্তমানে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ঘড়িটির দাম ৬০ ডলারেরও কম। আর এটি এসেছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে।
প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের নাম খোদাই করা ‘ক্যাসিও এএই-১২০০ডব্লিউএইচ’ মডেলের ঘড়িটি এখন মন্ত্রিসভার সদস্য, জ্যেষ্ঠ আমলা এবং রাজনৈতিক মিত্রদের হাতে শোভা পাচ্ছে।
‘ক্যাসিও রয়্যাল’ ডাকনামে পরিচিত এই ঘড়িটিতে রয়েছে ‘রেট্রো-ফিচারিস্টিক’ বা পুরোনো ও আধুনিকতার সংমিশ্রণধর্মী নকশা এবং এতে বিশ্বের মানচিত্র প্রদর্শনের বিশেষ সুবিধা রয়েছে। এটি এখন ক্ষমতার বলয়ে ঘনিষ্ঠতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। যারা এটি পরছেন, তাদের ‘ক্যাসিও কানেকশন’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
এই ঘড়িগুলো সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কেরই প্রতিফলন, যা আনুতিনকে গত কয়েক দশকের মধ্যে থাইল্যান্ডের অন্যতম স্থিতিশীল সরকার গঠনে সহায়তা করেছে। একজন দক্ষ রাজনৈতিক সমঝোতাকারী হিসেবে তিনি দেশটির বিভক্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন পক্ষের সাথে জোট গড়ে তুলেছেন—যার মধ্যে রয়েছে তার দল ‘ভুমজাইথাই পার্টি’র প্রভাবশালী সব প্রাদেশিক পরিবার থেকে শুরু করে শক্তিশালী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
ক্যাসিও ঘড়িটি উপহার পাওয়া ব্যক্তিদের একজন, উপ-পরিবহন মন্ত্রী সিরিপং আংকাসাকুলকিয়াত এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমরা যা পরিধান করি তার মূল্য কেবল তার দামের ওপর নির্ভর করে না। আমার কাছে এর আসল মূল্য নিহিত রয়েছে যিনি এটি উপহার দিয়েছেন, সেই ব্যক্তির মধ্যে।”
মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক এক বৈঠকের পর আনুতিনের কাছ থেকে তিনি ঘড়িটি পেয়েছিলেন এবং তখন থেকেই প্রায় প্রতিদিন এটি পরছেন। তিনি রসিকতা করে বলেন যে, হাজার হাজার ডলার মূল্যের বিলাসবহুল ঘড়ি পরা তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
সিরিপংয়ের ভাষ্যমতে, আনুতিন ব্যাংকক ও এর আশপাশের এলাকায় ভ্রমণের সময় ছোট দোকান বা বাজার থেকে এই ক্যাসিও ঘড়িগুলো কেনেন এবং উপহার দেওয়ার আগে সেগুলোতে নিজের নাম খোদাই করিয়ে নেন। সিরিপং নিজেও ঘড়িটি পাওয়ার জন্য বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করেছিলেন। উপহারপ্রাপ্তরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনাও শুরু করেছেন যে কে ধাতব (মেটাল) ব্যান্ডের ঘড়ি পেয়েছেন আর কে পেয়েছেন রেজিন ব্যান্ডের ঘড়ি।
সাধারণ বা অনাড়ম্বর চেহারার এই ক্যাসিও ঘড়িগুলো সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে চলমান একটি নতুন ধারার প্রতিফলন—যেখানে কম দামি বা সাধারণ কোনো বস্তুও সম্পদ, রুচি কিংবা বিশেষ কোনো মহলে প্রবেশের সুযোগের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। ‘কোয়াইট লাক্সারি’ বা অনাড়ম্বর বিলাসি পণ্য থেকে শুরু করে অভিজাত মডেলিং এজেন্সির নামযুক্ত সাধারণ ‘টোট ব্যাগ’—এসবের মাধ্যমে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পেতে পারে।
সরকারের মুখপাত্র এক্কাপব পিয়ানপিসেস এই উপহারের মাধ্যমে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বলয় বা ‘ইনার সার্কেল’ চিহ্নিত করার ধারণাকে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আনুতিন মূলত ঘড়িটির ব্যবহারিক উপযোগিতা পছন্দ করেন এবং অন্যদের সাথে তা ভাগ করে নিতে চান। এর সাথে রাজনৈতিক কোনো বিষয়ের সম্পর্ক নেই।”
তবে সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউট-এর ভিজিটিং ফেলো নাপন জাতুসরিপিতাকের মতে, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত উপহার হিসেবে এগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকতে পারে।
নাপন বলেন, “এগুলো হয়তো প্রতিদান দেওয়ার একটি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে এবং গ্রহীতার মধ্যে আনুগত্যের মনোভাব গড়ে তুলতে পারে—যার ফলে তিনি (আনুতিনকে) অনুসরণ করতে বা তার নির্দেশ মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন।”
উপহারপ্রাপ্তদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হলেন থামানাত প্রোমপো। তিনি একজন প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তি, যার ‘ক্লা থাম’ দলটি আনুতিনের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটে যোগ দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে। খোদাই করা নকশাযুক্ত একটি ক্যাসিও ঘড়ি পরে তার জনসমক্ষে আসাটা নতুন জোট গঠনের জল্পনাকে আরো উসকে দিয়েছে; বিশেষ করে যখন তার দলের মহাসচিব ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ঘড়িটি সরাসরি আনুতিন নিজের হাত থেকেই খুলে তাঁকে দিয়েছিলেন।
নাপন বলেন, “ওই ঘড়িগুলোর মাধ্যমে আনুতিনি নিশ্চিতভাবেই বন্ধু, অনুসারী এবং নিজস্ব একটি গোষ্ঠী বা বলয় গড়ে তুলছেন।”
সূত্র: এনডিটিভি অনলাইন
