রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের জোরালো সম্পৃক্ততা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরো গভীর করার পাশাপাশি দেশটিতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকার একটি হোটেলে ‘জোনটা ইন্টারন্যাশনাল, ডিস্ট্রিক্ট ২৫’ ও বাংলাদেশের ‘জোনটা ক্লাবসমূহ’ আয়োজিত জাতিসংঘ দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শামা ওবায়েদ। এ সময় তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তুলতে কার্যকর জাতিসংঘ ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংহতি অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বহুপাক্ষিকতাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার- জাতিসংঘের এই তিন মূল স্তম্ভের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অব্যাহত রয়েছে। শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের গঠনমূলক অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংলাপ, ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের ভূমিকা: মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে শামা ওবায়েদ জাতিসংঘের আরো জোরালো সম্পৃক্ততার আহ্বান জানান। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
জলবায়ু অর্থায়নে প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি: জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ৩১ সামনে রেখে শনিবার সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংলাপে জলবায়ু অর্থায়নের সংকট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবে পাওয়া অর্থের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সম্মেলনে বাংলাদেশের দর-কষাকষি জোরালো করতে সরকার, বেসরকারি খাত, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। আমরা শুধু জলবায়ু তহবিলের জন্য দর-কষাকষি করতে চাই না। আমরা গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বের অবস্থানে নিতে চাই।’
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ৩১ সামনে রেখে দেশের ৩৩টি নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এ সংলাপ ও জাতীয় অবস্থানপত্র প্রকাশের আয়োজন করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এ ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব নয়। সরকারের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন কর্মী হিসেবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে শতভাগ আন্তরিক। পরিবেশ নিয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো পর্যালোচনা করলেই তাঁর সংবেদনশীলতা বোঝা যায়। বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরতেও প্রধানমন্ত্রী আগ্রহী।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আলাদা শাখা খোলার কথা উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা এবং কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান ও দর-কষাকষি শক্তিশালী করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের সরকার, বেসরকারি খাত, বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীজনের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান থাকা জরুরি।
জলবায়ু অর্থায়নে উন্নত দেশগুলোর অনীহার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অর্থের অভাবের কথা বলে নতুন প্রতিশ্রুতি দিতেও অনীহা দেখা যাচ্ছে। অথচ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে এমন সীমাবদ্ধতা দেখা যায় না।’
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ২০২৫ সালে বিশ্বে সামরিক ব্যয় ছিল ২ হাজার ৮৮৭ বিলিয়ন ডলার।
কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অর্থপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর করা, কৃষি ও পানির নিরাপত্তায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং জলবায়ু প্রকল্প গ্রহণে কারিগরি সহযোগিতা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও মানুষের কাছে তহবিলের অর্থ পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এ সহায়তা মূলত অনুদান হিসেবে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের বোঝা না বাড়ে। পাশাপাশি জলবায়ু প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান আধা শতাংশেরও কম হলেও দেশটিকে প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। কপ৩১ সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র ও সম্মিলিত দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান। নাগরিক সমাজের প্রকাশিত অবস্থানপত্রের সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে সম্মেলনের আলোচনাকৌশল নির্ধারণের সময় বিবেচনা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় সংলাপে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী।
জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রত্যাশা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগে টোকিও থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেছেন, এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
শনিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে জলবায়ুবিষয়ক সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে কখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হবে, সেটি মন্ত্রণালয়ের একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো বিষয় নয়। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর টোকিও সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে, যা বর্তমানে আরো গভীর হয়েছে। বিএনপি সরকারের সময়গুলোতে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরো উন্নত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি, তৈরি পোশাক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এসব খাতে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার।
জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশ ইনভেস্ট’-এর মাধ্যমে আরো জাপানি বিনিয়োগ আনার প্রচেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর সফরেও অব্যাহত থাকবে। এ সফর প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬
