শুরুতে আশা ছিল, শেষটা হলো হতাশায়। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে জয়ের কাছাকাছি গিয়েও ড্র, এরপর ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের কাছে হার। আমিরাত সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাতাটা তাই প্রায় শূন্য। টেস্টে পাঁচ দিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশ যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছিল, ওয়ানডেতে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠছে, আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও কেন এমন অসহায় বাংলাদেশ? উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে কয়েকটি সমস্যা।
শুরুতেই ধাক্কা, হারিয়ে গেল পরিকল্পনা
ত্রিদেশীয় সিরিজটি ছিল লিটন দাসের পূর্ণ মেয়াদে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব শুরুর মঞ্চ। কিন্তু প্রথম ম্যাচের আগেই ডান নিতম্বের সংযোগস্থলের চোটে পুরো সিরিজ থেকে ছিটকে যান তিনি। নেতৃত্বের দায়িত্ব পান তাওহিদ হৃদয়। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয় বাংলাদেশকে।
লিটনের অনুপস্থিতি শুধু নেতৃত্বের জায়গায় শূন্যতা তৈরি করেনি, ব্যাটিংয়েও কেড়ে নিয়েছে দলের অভিজ্ঞ একজনকে। তবে একজনের অনুপস্থিতিকে সব ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানো যাবে না। বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা এবং নতুন সমন্বয়ে দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাখার দায়িত্বও টিম ম্যানেজমেন্টের।
ব্যাটিং অর্ডারে ভারসাম্য কোথায়?
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের আরেকটি দুর্বলতা হলো টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারের মধ্যে ভূমিকার স্পষ্টতা। দলে এমন একাধিক ব্যাটসম্যান আছেন, যাঁরা ওপেনিংয়ে বেশি স্বচ্ছন্দ। কিন্তু ওয়ানডেতে শুধু ওপেনিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেই হয় না; মাঝের ওভারগুলোতে চাপ সামলে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্যও দরকার।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে পারভেজ হোসেন ইমন ৭০ রান করেছেন, সাইফ হাসান করেছেন ৪১। দুজন মিলে চতুর্থ উইকেটের পতনের পর ৯৩ রানের জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে কিছুটা উদ্ধার করেছিলেন। কিন্তু সেই জুটি ভাঙার পর আবার দ্রুত উইকেট পড়তে থাকে। বাংলাদেশ ১৬০ রানে অলআউট হয় ৪১.২ ওভারে। আট নম্বরে শরীফুল ইসলামের ব্যাট করতে নামাও বুঝিয়েছে, ব্যাটিংয়ের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
একই সমস্যা দেখা গেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও। উদ্বোধনী জুটিতে ৪৭ রান এলেও পরে বড় কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি। শেষ দিকে তাসকিন আহমেদ ও রিশাদ হোসেনের ৩২ রানের জুটিই ছিল ইনিংসের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানে অলআউট হয়ে ৯৯ রানে হারে বাংলাদেশ।
জুটি নেই, তাই ঘুরে দাঁড়ানোও নেই
ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি উইকেট ধরে রাখাও জরুরি। শুরুতে উইকেট পড়ে গেলে পরের ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ব হয় ইনিংসটা গুছিয়ে নেওয়া। আবার ভালো শুরু পেলে সেটিকে বড় জুটিতে রূপ দিতে হয়। বাংলাদেশের দুই ম্যাচেই এই জায়গায় ঘাটতি ছিল।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম দুই উইকেট পড়ে মাত্র ৬ রানে। এরপর ২৮ রানে চতুর্থ উইকেট হারিয়ে দল পড়ে যায় বড় চাপে। সাইফ ও ইমনের জুটি আশা দেখালেও সেটিকে কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার মতো সংগ্রহ দাঁড় করানো যায়নি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শুরুটা তুলনামূলক ভালো হলেও একইভাবে ভেঙে পড়ে ইনিংস।
এখানে শুধু ব্যাটসম্যানদের ব্যক্তিগত সামর্থ্য নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। উইকেট পড়লে ঝুঁকি কমিয়ে জুটি গড়া, আবার হাতে উইকেট থাকলে রান তোলার গতি বাড়ানো—এই দুইয়ের ভারসাম্যই বাংলাদেশ খুঁজে পায়নি।
৫০ ওভারের ম্যাচ, কিন্তু ইনিংসই শেষ হচ্ছে আগেভাগে
ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫০ ওভার ব্যাটিং করার সুযোগ মানে শেষ পর্যন্ত সেই সময়টা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা। অথচ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ৩৩.৪ ওভারে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৬০ রানে অলআউট হতে লাগে ৪১.২ ওভার।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে শুধু জয়ের লক্ষ্য ছিল না, ফাইনালে ওঠার জন্য রান রেটের হিসাবও ছিল। সে কারণে দ্রুত রান তোলার তাগিদ ছিল। কিন্তু দ্রুত রান তোলার চেষ্টা আর তাড়াহুড়া করে উইকেট বিলিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়। শুরুতেই উইকেট হারানোর পরও ইনিংসকে লম্বা করার চেষ্টা করতে হতো। সেই জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে দল।
অবশ্য শুধু ৫০ ওভার খেললেই যে ম্যাচ জেতা নিশ্চিত, তা নয়। তবে প্রতিপক্ষের বোলিংয়ে চাপে পড়ে মাঝপথেই অলআউট হয়ে গেলে বড় লক্ষ্য তাড়া করা কিংবা রান রেট বাড়ানোর সুযোগ দুটোই কমে যায়।
আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়েকে আর ছোট করে দেখার সুযোগ নেই
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা আরও একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে এখন আর সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ নেই। আফগানিস্তান ওয়ানডেতে নিজেদের শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। জিম্বাবুয়েও বাংলাদেশের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সিরিজগুলোতে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছে। তাই অতীতের পরিচিতি দিয়ে বর্তমানের ম্যাচের হিসাব করা যাবে না।
প্রতিপক্ষের শক্তি মেনে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের দুর্বলতাও চিহ্নিত করতে হবে বাংলাদেশকে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হার এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ব্যাটিং ধস দেখিয়েছে, সমস্যা কেবল একজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি বা একটি খারাপ দিনের নয়। দল হিসেবে চাপ সামলানো, ব্যাটিংয়ের ভারসাম্য এবং ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সবখানেই উন্নতির প্রয়োজন।
