সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে তারা স্বামী-স্ত্রী নন বলে দাবি করেছেন নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির। তার ভাষ্য, সুইটি আক্তারকে তারা চেনেন না।
নজরুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের দাবি, আর্থিক সচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নজরুল। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর টানা তিন বছর তিন মাস কারাগারে ছিলেন।
আব্দুল বাছির বলেন, ছেলেকে কলেজে পড়ার সময় পরিবারের হাল ধরতে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। তার প্রশ্ন, ছেলে কখন বিয়ে করল? সুইটি আক্তার নজরুলের স্ত্রী নন এবং তারা ওই তরুণীকে চেনেনও না। শুনেছেন, তারা একই জায়গায় কাজ করতেন। তবে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে—এ তথ্যও সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, সৌদি আরবে যাওয়ার পর মাত্র ছয় মাস কাজ করতে পেরেছিলেন নজরুল। এরপর টানা তিন বছর তিন মাস কারাগারে ছিলেন। তবে কী কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তা এখনো জানতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা।
ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলেও জানান আব্দুল বাছির।
তিনি আরও বলেন, সাত লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে নজরুল মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন। বর্তমানে ঋণদাতারাও তাকে চাপ দিচ্ছেন। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বিনা কারণে তার ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়ে থাকলে তিনি এর বিচার চান।
স্বজনদের তথ্যমতে, ২৫ বছর বয়সী নজরুল ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। নজরুলের গ্রেপ্তারের খবর পরিবার জানতে পারলেও কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারেনি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি সরকার।
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে গ্রামের লোকজন তাদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, নজরুল এমন কোনো অপরাধ করেছেন বলে তিনি মনে করেন না, যার জন্য তাকে এ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য উদঘাটনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গাজী নিয়াজুল করিমের অভিযোগ, এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। তার দাবি, দূতাবাস যথাযথভাবে যোগাযোগ করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের একই ধরনের সাজা হওয়ার পর দেশটির দূতাবাস উদ্যোগ নিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার অভিযোগ, এখন পর্যন্ত নজরুলের পরিবারের সঙ্গেও কেউ যোগাযোগ করেনি।
গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন বলেন, সৌদি আরবে বিভিন্ন সামাজিক নীতিতে পরিবর্তন এলেও মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির ক্ষেত্রে আইনি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলেও তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
দরিদ্র কৃষক পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
