অভিষেক শর্মার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের পর নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে জয়ে ফিরেছে ভারত। ইন্দোরে সিরিজের ষষ্ঠ চেষ্টায় প্রথমবারের মতো প্রতিপক্ষকে রানের লক্ষ্য দিয়ে তা সফলভাবে আগলে রাখল স্বাগতিকেরা। অভিষেকের ৩০ বলে ৬৯ রানের ঝড়ো ইনিংসে ভর করে ভারত তোলে ২২৩ রান। জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০ ওভারে ২০৯ রান তুলতে সক্ষম হয়। ফলে ১৪ রানের জয় পায় ভারত।
গত দুই সপ্তাহে দুই দলের ম্যাচগুলোতে রানের যে বন্যা দেখা গেছে, তাতে ভারতের ২২৩ রানকে খুব বড় সংগ্রহ মনে না-ও হতে পারে। তবে ইন্দোরের উইকেটে বল নিচু হয়ে আসায় বড় শট খেলা ছিল কঠিন। সেই পরিস্থিতিতে অভিষেকের বিধ্বংসী ইনিংস ভারতকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়।
অভিষেকের প্রতি ওভারে ১৪ রানের গতিতে খেলা ইনিংসটি বাদ দিলে দুই দলের ব্যাটিংয়ের বাকি অংশে রান তোলার হার ছিল ওভারপ্রতি প্রায় ১০। ভারত শেষ ১৫ ওভারে তোলে ১৫৪ রান, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ পুরো ২০ ওভারে করে ২০৯ রান। ভারতের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত—৮.১ ওভারে ১ উইকেটে ১১৫ রান। কিন্তু সেখান থেকে দ্রুত ৫ উইকেটে ১৩৫ রানে নেমে যায় তারা। শেষ দিকে বড় সংগ্রহ গড়ার সুযোগও কাজে লাগাতে পারেনি স্বাগতিকেরা।
অন্যদিকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে। শিশির না থাকায় ভারতীয় বোলাররা বাড়তি সুবিধা পান। নতুন বলে বোলিংয়ে এসে শেষ দিকে অর্শদীপ সিং অবশেষে শাই হোপকে অল্প রানে ফিরিয়ে দেন। এরপর পরিকল্পিত বোলিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নাগালের বাইরে যেতে দেয়নি ভারত। মাঝের ওভারগুলোতে অক্ষর প্যাটেল ঘুরে দাঁড়ান। রাঁচিতে ৩.৩ ওভারে ৬৩ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকার পর এবার দারুণভাবে ফিরে আসেন তিনি। খণ্ডকালীন বোলার নমন ধীর ও নীতীশ কুমার রেড্ডিও নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। শেষ দিকে অর্শদীপ ও প্রিন্স যাদবের নিখুঁত ইয়র্কারে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভারতের হাতে চলে আসে।
আগের ম্যাচে বল হাতে দারুণ করা রোস্টন চেজের ওপর ভরসা রেখেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শুরুতে কিছুটা সময় নিয়ে ব্যাটিং করলেও পরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন অভিষেক। দ্বিতীয় ওভারে মিডউইকেটে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান সঞ্জু স্যামসন। ফলে ইনিংসের শুরুতেই দুই বাঁহাতি ব্যাটারকে বোলিং করার সুযোগ পান চেজ।
তবে চেজের পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করার সুযোগ মাত্র এক ওভারই কাজে লাগাতে দেন অভিষেক। নিজের দ্বিতীয় ওভারে জায়গা তৈরি করে দুটি ছক্কা ও একটি চার মারেন তিনি। এরপর কিমো পলের ওপর চড়াও হন ঈশান কিষান। দুজনের আক্রমণে পাওয়ার প্লের ছয় ওভারেই ১ উইকেটে ৮৭ রান তুলে ফেলে ভারত।
অভিষেকের ৬৯ রানের মধ্যে ৫০ রানই আসে অফসাইডে শট খেলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক ইনিংসে অফসাইডে এর চেয়ে বেশি রান তিনি মাত্র একবারই করেছেন। এই ইনিংসের পথেই টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্রুততম দুই হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
কিছুক্ষণ পর ঈশানকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলে প্রতিশোধ নেন চেজ। ১৮ বলে ৩৭ রান করে ফেরেন ঈশান। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য, রাতের বাকি অংশেও এমন আরও উইকেট হারাতে হয়েছে ভারতকে।
ঈশানের বিদায়ের পরই বোঝা যায়, রাঁচির মতো ইন্দোরের উইকেট অতটা সহজ নয়। অভিষেক ও ঈশানের দেওয়া উড়ন্ত সূচনার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে ভারতের মধ্যক্রম।
তিলক ভার্মাকে আবারও দারুণ ছন্দে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু অদ্ভুত কিছু ভুলে ইনিংসের শেষ দিকে গতি হারায় ভারত। লেগ সাইডে বল লাগিয়ে আউট হন নীতীশ রেড্ডি। বাউন্ডারি হয়েছে ভেবে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে রানআউট হন তিলক। অন্যদিকে, রান নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও অর্শদীপকে ‘না’ বলতে পারেননি অক্ষর প্যাটেল। ফলে রানআউট হন অর্শদীপ।
ছোট সীমানা ও সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে রান তাড়া করার সাফল্য বিবেচনায় বিরতিতে আত্মবিশ্বাসী ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
দ্বিতীয় ইনিংসে নতুন বল হাতে নিয়েই ব্যাটারদের বড় শট খেলার অসুবিধা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম ওভারে মায়াঙ্ক যাদব কিছুটা সুইং আদায় করলেও অর্শদীপ ঝুঁকি নেননি। শাই হোপকে লক্ষ্য করে ওভার দ্য উইকেট থেকে পরপর দুটি নিখুঁত ইয়র্কার করেন তিনি। এরপর লেংথ বল দিয়ে বোল্ড করে হোপকে ফিরিয়ে দেন এই বাঁহাতি পেসার।
মায়াঙ্ক যাদবের বলে ৫ রানে জীবন পাওয়া শিমরন হেটমায়ার অর্শদীপের দ্বিতীয় ওভারে ১৯ রান তুলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে গতি ফেরানোর চেষ্টা করেন। তবে মায়াঙ্ক ও প্রিন্স যাদব পাওয়ার প্লের বাকি সময় ভালো বোলিং করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১ উইকেটে ৫৪ রানে আটকে রাখেন।
অন্য প্রান্তে কামিল পুরান দ্রুত রান তুলতে পারছিলেন না। ফলে হেটমায়ারকে ঝুঁকি নিতে হয়। সপ্তম ওভারে নমন ধীরের বলে ছক্কা মারতে গিয়ে বিদায় নেন তিনি। এই সিরিজে ধীরের বলে ছক্কা মারার পরই আউট হওয়া চতুর্থ ব্যাটার ছিলেন হেটমায়ার।
এরপর অক্ষর ও ধীর টানা দুই ওভার ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চাপে রাখেন। দশম ওভারে রভম্যান পাওয়েলকে ফিরিয়ে দেন ধীর। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ৮২ রান।
পুরান ধীরের তৃতীয় ওভারে মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালিয়ে তিনটি ছক্কা মারেন। এতে তার রান তোলার গতি কিছুটা বাড়লেও চতুর্থবার বড় শট খেলতে গিয়ে বাউন্ডারিতে ক্যাচ দেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধীরের পাঁচটি উইকেটই এসেছে ছক্কা হজমের পরের বলে।
স্পিনাররা ভালো করলেও কুইন্টন স্যাম্পসন মাঠে নামতেই পেস আক্রমণে ফিরে যান শ্রেয়াস আইয়ার। স্যাম্পসন স্পিনের তুলনায় অতিরিক্ত গতির বলে অস্বস্তিতে পড়েন—এ তথ্য কাজে লাগিয়ে ভারতীয় দল পরিকল্পিতভাবে বোলিং সাজায়।
শেরফেন রাদারফোর্ড ও স্যাম্পসন পরের সাড়ে চার ওভার ওয়েস্ট ইন্ডিজকে লড়াইয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তবে ভারত উইকেট পেতে নিজেদের সেরা পেসারদের ওভার তখনই কাজে লাগাতে চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত নীতীশ রেড্ডি স্যাম্পসনকে ফিরিয়ে সেই পরিকল্পনায় সফল হন। দুই ওভারে ১৯ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন রেড্ডি।
শেষ চার ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল ৬৫ রান। রাদারফোর্ডের কাছ থেকে বড় কিছু আশা করলেও অর্শদীপ ও প্রিন্স যাদবের নিখুঁত ইয়র্কারে সেই আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। শেষ ওভারে অক্ষর প্যাটেলের হাতে ৩৬ রান রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেন অধিনায়ক। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য থেকে ১৪ রান দূরেই থামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে রান আগলে রেখে জয় তুলে নিল ভারত। অভিষেকের ঝড়ো ব্যাটিংয়ের সঙ্গে বোলারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিরিজে গুরুত্বপূর্ণ জয় পেল স্বাগতিকেরা।
