দুই ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন সম্পন্ন, ডিসেম্বরে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট সরবরাহের আশা
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এপিসিএস) স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন এবং অতিরিক্ত পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি নতুন গতি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের প্রথম বিদেশি প্রকল্প হিসেবে রূপপুরে আধুনিক ‘অপারেটর ইনফরমেশন সাপোর্ট সিস্টেম’ (ওআইএসএস) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রযুক্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।
রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রোসাটম অটোমেটেড কন্ট্রোল সিস্টেমসের (রাসু) সরবরাহ করা স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ৪৩টি সিস্টেমের অধীনে প্রায় ২০ হাজার সরঞ্জাম রয়েছে। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে চুল্লির স্থিতিশীলতাসহ সাত হাজারের বেশি প্রক্রিয়াগত পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনায় সম্ভাব্য বিচ্যুতি শনাক্ত করা এবং নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ওআইএসএস। বিদ্যুৎ ইউনিটের ডিজিটাল প্রতিরূপ বা ‘ডিজিটাল টুইন’ ব্যবহার করে তৈরি এ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে প্রথম ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং চালুকরণ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিটেও একই ধরনের ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রোসাটমের তথ্য অনুযায়ী, ওআইএসএস ৩৬০টি প্রক্রিয়াগত সিস্টেম থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিচ্যুতি শনাক্ত করে ৮০টির বেশি নির্দেশনার ভিত্তিতে অপারেটরদের প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেয়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জটিল পরিচালনাগত তথ্য সহজভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে কন্ট্রোল রুমের কর্মীদের দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে এই ব্যবস্থা।
রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সহযোগিতার অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প। একই সঙ্গে আধুনিক স্বয়ংক্রিয়করণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এটি একটি অগ্রগামী উদ্যোগ। বিদেশে নির্মিত রোসাটমের কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এই প্রথম অপারেটর ইনফরমেশন সাপোর্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সময় কমবে, পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মীরা নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন।
ক্রিটিক্যালিটি শুরুর অনুমোদন, চলছে নিরাপত্তা পরীক্ষা
এর আগে গত ৮ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ক্রিটিক্যালিটি শুরুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। তবে অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। এর জন্য আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও ধাপে ধাপে চালুকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা ও প্রযোজ্য নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করে প্রথম ইউনিটের ‘বি-ওয়ান’ পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের পরীক্ষাসংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে পরবর্তী ‘বি-টু’ পর্যায়ের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এই পর্যায়ে চুল্লির বিভিন্ন ব্যবস্থা যাচাইয়ের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিতভাবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে। চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর আগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা শর্তগুলো পূরণ করা জরুরি।
প্রকল্প সূত্রের দাবি, নিরাপত্তা ভালভে ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপে পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরীক্ষা সফল হলে পরবর্তী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
কঠোর নিরাপত্তায় পৌঁছেছে অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত পারমাণবিক জ্বালানিও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এসব জ্বালানি পরিবহন করা হয়। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করে পারমাণবিক জ্বালানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্ধারিত বিশেষ স্থাপনায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পর নির্ধারিত পরিচালনচক্র অনুযায়ী একপর্যায়ে জ্বালানি অ্যাসেম্বলি পরিবর্তন করতে হয়। প্রথম ইউনিটের জন্য আনা অতিরিক্ত জ্বালানি ভবিষ্যৎ পরিচালন কার্যক্রমের প্রস্তুতির অংশ।
রোসাটমের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট নয়টি চালানে ২০০টির বেশি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব জ্বালানির সরবরাহ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিটের জন্য আনা পারমাণবিক জ্বালানি চলতি বছরের মে মাসে চুল্লিতে স্থাপন করা হয়।
ডিসেম্বরে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য
রাশিয়ার প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মাধ্যমে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ চুল্লি রয়েছে। দুটি ইউনিট চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও পর্যবেক্ষণ শেষে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছালে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, নির্ধারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত যাচাই এবং চালুকরণ কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর।
সব মিলিয়ে, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপন, ক্রিটিক্যালিটি শুরুর অনুমোদন এবং অতিরিক্ত পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন নির্ধারিত নিরাপত্তা মান বজায় রেখে বাকি পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান লক্ষ্য।

