আবু হায়াত বিশ্বাস: জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে চাপ বাড়াল ইন্ডিয়া ব্লক। দিল্লিতে গত কয়েকদিনের আন্দোলন হয়েছে। পুলিশ আটক করেছে বিক্ষোভকারীদের। তবে সোমবার আগের সব ভিড় ছাপিয়ে গেল। লাঠি, ঢাল হাতে দাড়িয়ে পুলিশ অসহায়ের মতো কেবল দেখল। বিরোধীদের কনস্টিটিউশন ক্লাব থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মিছিলে উপচে পড়ল ভিড়। আক্ষিরক অর্থেই জনসমুদ্র! রাস্তার দু’ধারে দাড়িয়ে সরকারি দপ্তরের কর্মীরা। বিরোধী নেতাদের এক ঝলক দেখার জন্য। হাজার হাজার মানুষের ভিড় থেকে আওয়াজ উঠল, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের।
দিল্লির রফি মার্গ থেকে মিনিট কুড়ির রাস্তা সুপ্রিম কোর্ট। ভিড়ের বহর এতটাই ছিল যে সুপ্রিম কোর্টের অনেক আগেই ভগবান দাস রোড পর্যন্ত পৌঁছতেই লেগে গেল প্রায় ৩ ঘণ্টা। ভগবান দাস মার্গে আটকে দেওয়া হয় বিরোধী জোটের মিছিল। সেখানে মানব-শৃঙ্খল গড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন আধাসেনা জওয়ানেরা। সোমবার বেলা যত গড়াল কালো মাথার ভিড় ততই বাড়ল। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, আইসা নেত্রী নেহা বোরাদের বাস থেকে নেমে হাঁটতেও হল। কিছুক্ষণ পদযাত্রার পর ট্রাকে উঠলেন তারা। সন্ধ্যায় রাহুল, মল্লিকার্জুন খাড়গেরা সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে গেলেন। পুলিশি বাধা অতিক্রম করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানানোয় স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী শিবির উচ্ছ্বসিত। সূত্রের খবর,কংগ্রেস সাংসদদের দিল্লিতে আগামী ৪-৫ দিন থেকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকে আরও তীব্র করা হবে বলে জানিয়েছে হাত শিবির। জানা গিয়েছে, নতুন রণকৌশল নিয়ে মঙ্গলবার থেকে আরও আগ্রাসী হবে আন্দোলন।
ইন্ডিয়া ব্লকের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল, সোমবার সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করে যাবেন তারা। প্রধান বিচারপতির হাতে তুলে দেবেন স্মারকলিপি। তবে রবিবারই প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, তিনি কোনও সাক্ষাত করতে চান না। বিরোধীরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে, সেই পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই মতোই এদিন রাহুল গান্ধী সহ বিরোধী জোটের ১১ জন নেতা সর্বোচ্চ আদালতে পিটিশন ফাইল করেছেন এসআইআর, ভোট চুরি, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে। সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবির পাশাপাশি নির্বাচনী তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে শীর্ষ আদালতে রিট আবেদন করা হয়। মামলাকারীদের তালিকায় রাহুল, খাড়গে ছাড়াও রয়েছেন , তৃণমূলের সৌগত রায়, সপার অখিলেশ যাদব, আরজেডির তেজস্বী যাদব, সিপিএমের এমএ বেবি, শিবসেনার সঞ্জয় রাউত প্রমুখ।
এদিন দুপুর আড়াইটে নাগাদ কনস্টিটিউশন ক্লাব থেকে দুটি বাসে করে বিরোধী সাংসদরা সুপ্রিম কোর্টের দিকে যাত্রা শুরু করেন। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা ব্যানার্জি, অখিলশ যাদব, তেজস্বী যাদব থেকে যোগেন্দ্র যাদব, নেহা বোরা,প্রিয়াঙ্কা গান্ধীরা ছিলেন। এছাড়াও বিরোধী শিবিরের সাংসদরাও ছিলেন। দেখা যায় কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমার, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডিদেরও। মল্লিকার্জুন খাড়গেকে ব্যাটম্যানের মুখোশ পরে কংগ্রেস নেতা তথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। এছাড়াও এক সমর্থকের হাত থেকে ৫৬ ইঞ্চির মোদি মূর্তি নিয়ে উঁচু করে ধরতে দেখা যায় রাহুলকে। ইন্ডিয়ার মিছিলেই কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের হাতে ‘ব্যাটম্যান’ মাস্ক দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
মিছিল চলাকালীন কংগ্রেসের পতাকা গলায় এক কর্মী ভিড়ের মধ্যে থেকে ব্যাটম্যানের মুখোশ উঁচিয়ে ধরেন। পরে সেই মুখোশ পৌঁছে যায় লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর হাতে। তারা মুখোশ পরেন। রাহুল গান্ধীকে ‘ব্যাটম্যান’-এর সঙ্গে তুলনা করার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত আগস্টে ইনস্টাগ্রামে প্রশ্নোত্তর পর্বে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কি ব্যাটম্যান? উত্তরে রসিকতা করে রাহুল বলেছিলেন, 'আমাকে এবং ব্যাটম্যানকে একই ঘরে কেউ কখনও দেখেনি!' দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দপ্তরের ইন্দিরা ভবনের কাছেও রাহুলকে ‘রিয়েল লাইফ ব্যাটম্যান’ হিসেবে তুলে ধরে পোস্টার লাগানো হয়েছিল। সেখানে তাঁকে ‘নীরব অভিভাবক’ ও ‘সতর্ক রক্ষক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
মিছিলে অংশ নেওয়া সিপিআই নেতা ডি রাজা বলেন, ‘আমরা একটি পিটিশন দাখিল করেছি। গোটা দেশ জানে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ আন্দোলন করছেন, প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বর্তমান সিইসি-র পদত্যাগ করা উচিত, অথবা তাঁকে অপসারণ করা উচিত। নির্বাচন কমিশন তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।’ এদিকে, বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর রাহুল গান্ধীকে নিশানা করেন। অনুরাগ বলেছেন,‘ওরা শুধু অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে জানে। সাংবিধানিক পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করা, আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করা এবং দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করাই ওদের কাজ। এমন একজন অস্থিতিশীল, অরাজক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বিরোধী দলনেতার এই ধরনের নাটকবাজি ও হঠকারিতা দেশকে আগে কখনও দেখতে হয়নি। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
