যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ। এদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, কম মজুরি, বাড়ির আকাশছোঁয়া দাম ও অর্থসংকটে থাকা স্কুলের প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।
ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের বিক্ষোভ কখনও কখনও সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে গড়িয়েছে, যদিও অনেক বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। অস্থিরতার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্রান্স। শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কয়েক সপ্তাহের শিক্ষার্থী আন্দোলনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সারা দেশে ৫ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।
এ অস্থিরতা সরকারগুলোর সামাল দিতে না পারা আর্থিক চাপের দিকে নজর ঘুরিয়েছে। বছরের পর বছর বেশি ঋণ নেওয়ায় ইউরোপের অনেক দেশ গভীর ঋণে ডুবেছে, আর সেই ঋণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হচ্ছে। ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ। সুদে সরকার যত বেশি ব্যয় করছে, বিক্ষোভকারীদের চাওয়া স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের জন্য তত কম অর্থ থাকছে।
সরকার মানুষের মতোই ঋণ নেয়, তবে ব্যাংকে যাওয়ার বদলে বন্ড বিক্রি করে। বিনিময়ে ক্রেতাদের সুদ দেয় এবং নির্দিষ্ট তারিখে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১০ বছরের বন্ড এমন ঋণ, যা সরকার এক দশক পর শোধ করে। ঋণদাতারা যে আয় পান, সেই ইয়িল্ড দেখে মূলত বোঝা যায়, ঋণ সামলানোর সক্ষমতায় বাজার একটি দেশকে কতটা বিশ্বাস করে।
বন্ডের দাম পড়লে ইয়িল্ড বাড়ে, ফলে ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়। উচ্চ হারের বন্ধকির মুখে পড়া পরিবারের মতো সরকারকেও তখন সুদে বেশি ব্যয় করতে হয়, আর স্কুল, হাসপাতাল ও সড়কের মতো প্রয়োজনীয় খাতে অর্থ কমে যায়। ইউরোর যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর ২০০০-এর দশকের শুরুর পর থেকে ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর ১০ বছরের ঋণ ব্যয় ৫ শতাংশে পৌঁছায়নি।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় শুধু গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলো এ হার বা এর বেশি সুদ দিয়েছিল। ৭ শতাংশের ওপরে ইয়িল্ড আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে বেইলআউটের দিকে ঠেলে দেয়। ফ্রান্স এখন ১০ বছরের জন্য ঋণ নিতে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দেয়, জার্মানির ক্ষেত্রে যা ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। বাড়তে থাকা এ ব্যবধান দেখায়, ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা বেশি আয় চান।
ইউরো অঞ্চল ও যুক্তরাজ্যজুড়ে ১০ বছরের ঋণ ব্যয়ের চিত্রে দেখা যায়, ফ্রান্স এখন ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদ দিচ্ছে, অথচ ওই দুই দেশ ইউরোজোনের ঋণসংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল। ইউরোর বাইরে থাকা কেবল যুক্তরাজ্য এর চেয়ে বেশি সুদ দেয়।
কোন দেশ কত ঋণে
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ সবচেয়ে বেশি, ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির অর্থনীতি বা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা পায় যুক্তরাষ্ট্র, যা দেশটির ঋণের বৈশ্বিক চাহিদা ধরে রাখে। তবে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা অসীম নয়।
এরপর রয়েছে চীন, ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। জাপানের ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, আর প্রধান অর্থনীতির মধ্যে ঋণ-অনুপাত সবচেয়ে বেশি, জিডিপির ১৯৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০২ শতাংশ। বিশ্বে ফ্রান্সের অবস্থান পঞ্চম, ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি ইতালির ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি, তবে অর্থনীতির তুলনায় ইতালির ঋণ বেশি, ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশ।
আইএমএফের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে উঠবে। এতে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই পথে আনার প্রচেষ্টা জটিল হচ্ছে।
ঋণসংকটে বাংলাদেশের অবস্থান
আল জাজিরার ২২ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত অর্থনীতিগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করেছে। বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতি এখনই অনিবার্য ঋণসংকটের সমতুল্য নয়। তবে রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ঋণ বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের সামগ্রিক ও বৈদেশিক ঋণসংকটের ঝুঁকি মাঝারি অর্থাৎ ৪৫তম অবস্থানে রয়েছে, প্রতিবেশি দেশ ভারতের অবস্থান ৮ ঋণের যার পরিমাণ ৩.৪ ট্রিলিয়ন। তবে আকস্মিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ঋণ কত?
আইএমএফের ২০২৬ সালের ঋণ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮৮.৮ বিলিয়ন ডলার, যা ওই অর্থবছরের জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিল অভ্যন্তরীণ ঋণ।
৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সুদের বিল
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, সরকার, পরিবার ও কোম্পানির ঋণসহ বৈশ্বিক ঋণ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। এটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। বাড়তি ঋণের বড় অংশ এসেছে উদীয়মান বাজার থেকে।
এ ঋণ শোধের খরচও বিশাল। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি দিয়েছে। এ অঙ্ক বিশ্বের প্রতিরক্ষা ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার খাতের ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
সাধারণ মানুষের কাছে সুদের ব্যয় বাড়ার অর্থ স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো সেবার জন্য কম অর্থ। বিল মেটাতে সরকারকে কর বাড়াতে বা ব্যয় কাটতে হতে পারে। সরকারি ঋণ ব্যয় বাড়লে বন্ধকি, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে। - সূত্র: আল জাজিরা
