ঝুঁকিতে বিশ্বের ৯৬ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৬ এএম
আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
-->জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে থাকা অগভীর পানির প্রায় সমস্ত প্রবাল প্রাচীর ২০৭৫ সালের মধ্যে ধসে পড়ার বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রবাল প্রাচীরের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।
বিশ্বের ১২৭টি ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীর ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত প্রথম পদ্ধতিগত সমীক্ষায় আইইউসিএন জানিয়েছে, এর ৯৬ শতাংশ প্রবাল প্রাচীরই মারাত্মক বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে, যা তাদের ঝুঁকির সর্বোচ্চ বিভাগ।
অগভীর পানির প্রবাল প্রাচীরগুলো মূলত ৪০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পাওয়া যায়। বর্ণিল এই বাস্তুতন্ত্রগুলো জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোরাল ট্রায়াঙ্গেল, মেসোআমেরিকান রিফ সিস্টেম এবং লোহিত সাগরের প্রবাল প্রাচীরগুলো।
আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে আয়োজিত জাতিসংঘের কপ-১৭ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে এই গবেষণা উপস্থাপন করে আইইউসিএন জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তাপীয় চাপ বা উত্তাপই বিশ্বব্যাপী প্রবাল প্রাচীর ধ্বংসের প্রধান ও সবচেয়ে ধারাবাহিক হুমকি।
প্রবালগুলো তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর অর্থ হলো, পানি যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন প্রবালগুলো তাদের টিস্যুতে বাস করা ক্ষুদ্র শৈবালগুলোকে বের করে দেয়, যা তাদের পুষ্টির প্রধান উৎস। এর ফলে প্রবালগুলো সাদা হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হতে পারে।
অতিরিক্ত মাছ ধরাও এর আরেকটি বড় হুমকি। বিশেষ করে প্যারোটফিশ এবং গ্রুপার জাতীয় মাছ অতিরিক্ত শিকার করার ফলে প্রবাল বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ এই মাছগুলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। এছাড়া উপকূলীয় উন্নয়ন, দূষণ, পর্যটন এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া তীব্র ঝড়ও প্রবাল প্রাচীর ধ্বংসের জন্য দায়ী।
শক্ত প্রবালগুলো অদৃশ্য হয়ে গেলে সেই স্থানগুলো শৈবাল, পাথর ও স্পঞ্জ দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে সেখানে প্রজাতি বৈচিত্র্য কমে যায় এবং আগের মতো অনেক প্রাণী বাঁচতে পারে না। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে রিফ ফিশ, ঝিনুক, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং হাঙর।
প্রবালপ্রাচীরগুলোকে কি এখনো বাঁচানো সম্ভব
আইইউসিএন রেড লিস্ট অব কোরাল রিফ ইকোসিস্টেমের বৈজ্ঞানিক প্রধান মিশাল গুডকা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যতের হুমকি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং স্পষ্ট, যা এই বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার ওপর অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই গবেষণায় জাতিসংঘের ইন্টারগভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ- এর একটি জলবায়ু পরিস্থিতি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এই হতাশাজনক পূর্বাভাসের মধ্যেও আইইউসিএন জানিয়েছে যে, বেশিরভাগ প্রবাল প্রাচীর এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস বাদ দিয়ে কেবল গত ৫০ বছরের পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করলে দেখা যায়, বর্তমানে মাত্র ২৪ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর মারাত্মক বিপন্ন শ্রেণীতে পড়বে।
গুডকা ব্যাখ্যা করে বলেন, সর্বোত্তম ফলাফল নিশ্চিত করতে এবং সবচেয়ে খারাপ পরিণতি রোধ করার জন্য এটি আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পদক্ষেপ জোরদার করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তিনি আরও বলেন, আগামী কয়েক বছরে আমরা কী পদক্ষেপ নেব তা-ই নির্ধারণ করবে চলতি শতাব্দীর শেষে এই বাস্তুতন্ত্রগুলো কেমন থাকবে এগুলো কি আমরা যেভাবে চিনে এসেছি সেভাবেই টিকে থাকবে, নাকি অন্য কোনো বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে যা প্রকৃতি ও মানুষ উভয়ের জন্যই কম মূল্যবান।
আইইউসিএন-এর মহাপরিচালক গ্রেথেল অ্যাগুইলার বলেন, প্রবাল প্রাচীরগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।
তিনি যোগ করেন, আমাদের কী করতে হবে তা আমরা জানি: উচ্চাভিলাষী কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা, আরও শক্তিশালী সুরক্ষা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো এবং স্থিতিস্থাপক উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও তার ওপর নির্ভরশীল সম্প্রদায়গুলোর পেছনে টেকসই বিনিয়োগ করা।
তামান্না রুপা/
আরও পড়ুন
দেখা পেলাম শ্বেত শার্দুলের
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
কুয়াকাটার পশ্চিম খাজুরা এলাকার একটি বাবলা গাছে শ্বেত শার্দুল প্রজাপতি। ছবি: লেখক
-->চলতি অক্টোবর মাসের ঘটনা। কিছু বিরল ও পন্থ-পরিযায়ী পাখির খোঁজে দুদিন ধরে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের লেম্বুর বনে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়েও অসহ্য গরম। প্রথম দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত সৈকত ও বাদাবনে ঘুরে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পাখির ছবি তুলতে পারলেও যেসব পাখির খোঁজে এসেছি তার একটিরও দেখা পেলাম না। দ্বিতীয় দিন সকাল ৮টা আট মিনিটে ভুজঙ্গ (Crow-billed Drongo) নামে একটি অতি বিরল ও তথ্য অপ্রতুল পাখির দেখা পেলাম। দুদিনের কষ্টের পর এটা হলো পরম পাওয়া। জীবনে প্রথম পাখিটিকে দেখলাম। সূত্রমতে, এর আগে এটিকে এ দেশে দশবারেরও কম দেখা গেছে। যাহোক, নতুন একটি পাখির ছবি তুলে কিছুক্ষণ পর দোলনা পয়েন্ট থেকে শুঁটকিপাড়ায় এলাম নাশতা করতে। নাশতা সেরে আমি, পক্ষী আলোকচিত্রী আবু বকর সিদ্দিক ও আনোয়ারুল আজিম বাদে বাকিরা হোটেলে চলে গেল।
আমরা তিনজন রেস্টুরেন্টের পেছনের মাঠ পেরিয়ে পুকুরের কাছে এসে বেশ কয়েক প্রজাতির পাখি দেখলাম। এরপর বাদাবন পেরিয়ে বেড়িবাঁধের পাশে চলে এলাম। এই জায়গাটির নাম পশ্চিম খাজুরা। একপাশে বাদাবন, এরপর কিছুটা খালি জায়গা, তারপর বাবলা গাছের সারি এবং সবশেষে বেড়িবাঁধ। এভাবে প্রায় দেড়-দুই কিলোমিটার চলে যাওয়ার পর খালগোড়া নামক স্থানে বন বিভাগের অফিস। আমরা তিনজন বাদাবন ও বাবলা গাছের সারির মাঝখান দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। হাঁটার শুরুতেই বাদাবনের একটি বড় কেওড়া গাছে একঝাঁক চম্পাবাদুড়কে উল্টো হয়ে ঝুলে চেঁচামেচি করতে দেখলাম। বাদাবনের পাশে খানিক পর পর এক চিলতে করে জলা। সেখানে ফুটে আছে সাদা ও বেগুনি শাপলা এবং কচুরিপানার ফুল। দেখতে দারুণ লাগছে।
ফুলগুলোর বেশ কয়টি ছবি তুলে সামনের দিকে হাঁটা দিতেই বাবলা গাছের দিকে সাদা-কালো-সোনালি কিছু একটাকে উড়ে যেতে দেখে ওর পিছু নিলাম। কিন্তু অস্থির পতঙ্গটি কোনোভাবেই গাছে বসছে না। ওর পেছনে হাঁটতে হাঁটতে ঘেমে নেয়ে উঠলাম। অবশেষে সকাল ১০টা ২৭ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে মাত্র তিন সেকেন্ডের জন্য বাবলা ফুলের ওপর পতঙ্গটি বসল। দুই ক্লিকে মাত্র পাঁচটি ছবি তুললাম। এরপর পতঙ্গটিও পালিয়ে গেল। ওকে সর্বপ্রথম দেখি ২০১৪ সালের ১৪ মার্চ সুন্দরবনের জামতলীর এক গাছে। এরপর থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত দেখছি পতঙ্গটিকে। তবে সুন্দরবনের বাইরে এই প্রথম ওর দেখা পেলাম।
এতক্ষণ যে পতঙ্গটির কথা বললাম, সে এ দেশের এক বিরল ও বিপন্ন প্রজাপতি। ওর কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। এটি পশ্চিমবঙ্গে সুষমা নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম White Tiger বা Black-veined Tiger। ইংরেজি নাম ও এ দেশে ওর অন্য জাতভাইদের নামের ধারাবাহিকতায় আমি ওর নাম দিলাম শ্বেত শার্দুল। নিম্ফালিডি গোত্র ও ড্যানাইনি উপ-গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Danaus melanippus (দানুয়াস ম্যালনিপ্পাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, তাইওয়ান ও চীনে প্রজাপতিটির অস্তিত্ব রয়েছে।
শ্বেত শার্দুল মোটামুটি বড় আকারের প্রজাপতি। ডানা দুটোর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৮০-৯৫ মিলিমিটার। কস্তুরী শার্দুলের (Striped Tiger) সঙ্গে চেহারার বেশ মিল রয়েছে। তবে, মূল পাথর্ক্য হলো এর পেছনের ডানায় গাঢ় কমলার পরিবর্তে সাদা রং থাকে। এ ছাড়া পুরুষের পেছনের ডানার নিচে সুগন্ধি আঁশের থলে থাকে।
সুন্দরবন ছাড়াও চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারেও এদের দেখা যায়। এবার এই তালিকায় কুয়াকাটাও যুক্ত হলো। সচরাচর বনের প্রান্ত ও হালকা ঝোপঝাড়ে বিচরণ করে। দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। সাধারণত ধীরগতিতে স্থিরভাবে উড়ে। তবে বিপদাশঙ্কায় দ্রুত উড়তে পারে। রস পানের জন্য ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়। গাছের মগডালে বিশ্রাম নেয়। এরা পরিযায়ী হতে পারে।
শ্বেত শার্দুলের জীবনচক্র পুরোপুরি জানা না গেলেও অন্যান্য শার্দুলের সঙ্গে মিল রয়েছে। এরা ফুলকুঁড়ি, সৈকত সূর্যমূখী, বন অতসী, ল্যান্টানা প্রভৃতি গাছে ডিম পাড়ে ও জীবনচক্র সম্পন্ন করে বলে জানা যায়। স্ত্রী প্রজাপতি এসব গাছের কচি পাতার নিচের প্রান্তে পাতাপ্রতি একটি করে লম্বালম্বি খাঁজযুক্ত কালচে-ধূসর বুলেটের মাথা আকৃতির ডিম পাড়ে। সদ্যফোটা শুককীটের মাথা কালো; এর সাদা দেহ কালো ডোরাযুক্ত। খোলস পাল্টে শুককীটের দেহ কালো বর্ণ ধারণ করে। দেহের দুই পাশে থাকে হলদে ফোঁটাযুক্ত সাদা রেখা। পিঠের ওপর সাদা ডোরা ও হলুদ ফোঁটার সারি পর পর সাজানো থাকে। পিঠে আরও থাকে তিনজোড়া কালো কাঁটার মতো যাদের গোড়া লাল। মুককীটের রং সবুজ। সাত থেকে ১৪ দিন পর মুককীটের খোলস কেটে বেরিয়ে আসে শ্বেত শার্দুল প্রজাপতি। তবে এই প্রজাপতি বাঁচে মাত্র ৭-১৪ দিন।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়ুন
নাম দিয়েছি তারাঝরা
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২০ এএম
আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংক অফিস প্রাঙ্গণে হেমন্তে ফুটেছে তারাঝরা ফুল। ছবি: লেখক
-->‘সামনেই লতা ভরেছে সাদা ফুলে–
বিলিতি নাম, মনে থাকে না–
নাম দিয়েছি তারাঝরা;
রাতের বেলায় গন্ধ তার
ফুলবাগানের প্রলাপের মতো।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্যামলী কাব্যের ‘সম্ভাষণ’ কবিতায় বিদেশি এক লতানো ফুলের নাম দিয়েছেন ‘তারাঝরা’। বিদেশি নামের বদলে বাংলা ভাষায় ফুলটিকে আপন করে নেওয়ার এই প্রয়াসে মিশে আছে কবির প্রকৃতিপ্রেম ও কল্পনার সৌন্দর্য। কবিতায় ফুলটির প্রজাতি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে ক্লিমেটিস গণের কোনো ফুলের সঙ্গে এর মিল থাকতে পারে।
হেমন্তের শুরু। আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে পথের ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নাকে এল মিষ্টি সুগন্ধ। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি, লাল সিরামিক ইটের দেয়াল বেয়ে একটি লতা বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে ঝোপ তৈরি করেছে। অজস্র সাদাটে ফুলে ভরে আছে তার ডালপালা। মৃদু রোদে ফুলগুলোর শুভ্রতা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মাদকতাময় সুবাসে চারপাশের বাতাস যেন ভরে উঠেছে। পাশেই আরেকটি সুগন্ধি ফুলের ঝোপ–বেলি। দুই ফুলের ঘ্রাণ মিলে তৈরি করেছে এক মনোরম পরিবেশ।
তারার মতো অসংখ্য ফুলের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ‘তারাঝরা’ নামটি মনে পড়ে। মনে হয়, বসন্তরাতের আকাশের তারাগুলো বুঝি মাটিতে নেমে এসে আশ্রয় নিয়েছে সবুজ লতার বুকে। কবির কল্পনায় পরদেশি ফুলের মঞ্জরি যেন প্রিয়তমার কালো খোঁপায় গেঁথে দেওয়া তারার মালা। তিনি লিখেছেন–
‘সে কথা মনে মনে গড়ে তুলেছি
যেমন করে তুমি জড়িয়ে তুলেছ তোমার খোঁপা।
বলব, ‘প্রিয়ে, এই পরদেশী ফুলের মঞ্জরী
আকাশে চেয়ে খুঁজছিল বসন্তের রাত্রি,
এনেছি আমি তাকে দয়া করে
তোমার ওই কালো চুলে।’
লতাজুড়ে ফুটে থাকা অসংখ্য সাদাটে ফুলের দিকে তাকালে কবিতার এই চিত্রকল্প আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। সবুজ লতা যেন প্রিয়তমার শ্যামল খোঁপা, আর তার বুকে ফুটে থাকা ফুলগুলো যেন একেকটি উজ্জ্বল তারা।
ক্লিমেটিস (Clematis) রানানকুলেসি (Ranunculaceae) গোত্রের একটি উদ্ভিদ গণ। এ গণের অধিকাংশ প্রজাতি লতানো বা আরোহী স্বভাবের। অনেক প্রজাতির কাণ্ড কাষ্ঠল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ক্লিমেটিসের বহু প্রজাতি জন্মে। এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি ও সংকর জাত বাগানে শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে চাষ করা হয়। প্রজাতিভেদে ফুলের আকার, রং, গঠন ও সুগন্ধে পার্থক্য দেখা যায়।
ক্লিমেটিসের আধুনিক উদ্যানজাতগুলোর ইতিহাসে Clematis × jackmanii একটি উল্লেখযোগ্য নাম। উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের জ্যাকম্যান পরিবারের নার্সারিতে এই সংকর জাত তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৮৬২ সালে গাছটিতে প্রথম ফুল ফোটে এবং পরের বছর এটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচিতি লাভ করে। এর ফুল বড় ও গাঢ় বেগুনি রঙের। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের উদ্যানবিদরা ক্লিমেটিসের আরও বহু সংকর জাত উদ্ভাবন করেন, যেগুলো ফুলের রং, আকার ও গঠনের বৈচিত্র্যের জন্য বাগানপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের ‘তারাঝরা’ ফুলটি ঠিক কোন প্রজাতির ক্লিমেটিস, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক উদ্ভিদবৈচিত্র্যে ক্লিমেটিসের একটি উল্লেখযোগ্য প্রজাতি হলো Clematis gouriana Roxb. ex DC.। কিউয়ের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের Plants of the World Online-এ প্রজাতিটিকে স্বীকৃত উদ্ভিদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে এর বিস্তৃতি রয়েছে।
প্রজাতিটির নামের শেষাংশ gouriana এবং প্রাচীন বাংলার গৌড়ের নামের মধ্যে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। এর তেলেগু নাম হিসেবেও ‘গৌরী-কুন্তলা’ নামটি পাওয়া যায়। এই গৌরী নামের সঙ্গে এ ফুলের প্রজাতিগত নামের শেষাংশেরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এর ইংরেজি নাম Indian Clematis, Gourian Clematis, Indian Clematis বা Indian travelers's joy. এটি একটি বড় কাষ্ঠল লতানো বা আরোহী স্বভাবের গুল্ম প্রকৃতির উদ্ভিদ। সহায়ক পেলে লতা ৩ থেকে ৮ মিটার লম্বা হতে পারে। ফুলের গড়ন খানিকটা লেবু ফুলের মতো, আকারে ছোট, সবুজাভ-সাদা বা হলুদাভ-সাদা, ১৫ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা শাখায়িত পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য সুগন্ধী ফুল ফোটে। ফুলের পাপড়ির বিস্তার প্রায় ২ সেন্টিমিটার, চারটি বৃতি থাকে, যা দেখতে পাপড়ির মতোই দেখায়। কেন্দ্রস্থলে ঝুঁটির মতো গুচ্ছাকারে থাকে জননকেশরগুচ্ছ। ফুল ফোটার সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। পাতা ১ দশমিক ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার লম্বা, ডিম্বাকার-বর্শাকৃতি, শীর্ষাগ্র সুচালো, গোড়ার দিক গোলাকার। সবুজ পাতাগুলো লতার দুই পাশে বিপরীতমুখীভাবে সজ্জিত থাকে। বসন্তের শেষে বা গ্রীষ্মের শুরুতে শাখা কলম বা কাটিং অথবা দাবাকলম করে এর চারা তৈরি করা যায়। একসঙ্গে সহজে বিপুলসংখ্যক চারা দ্রুত তৈরি করা হচ্ছে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে। ছাদবাগান বা খোলা বাগান–সব জায়গাতেই এটি লাগানো যায়। জুঁইয়ের চেয়ে এখন এ ফুলের কদর বাড়ছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
আরও পড়ুন
ডোরা ডানার লম্বা-পদী মাছি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
রমনা উদ্যানে শরৎকালে দেখা ডোরা ডানার লম্বা-পদী মাছি। ছবি: লেখক
-->প্রায় প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে যাই রমনা উদ্যানে। চোখের সামনে কত কিছুই না পড়ে! চলতি মাসের ৪ তারিখে হাঁটার রাউন্ড শেষ করে নার্সারির ভেতরে ঢোকার আগেই কয়েকটি নীলজবার চারাগাছ চোখে পড়ল। রাতের শিশিরে ভিজে আছে পাতাগুলো। একটি পাতার ওপর বসে থাকা পোকাটি দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মনে হলো, সে যেন ব্যায়াম করছে। ছয়টি লম্বা ও সরু পায়ের মধ্যে সামনের জোড়াটি সামনে বাড়িয়ে কখনো একটির ডগা অন্যটির সঙ্গে ঠেকাচ্ছে, কখনো আবার হাতের তালু ঘষার মতো পরস্পরের সঙ্গে ঘষছে। কিছুক্ষণ পর সামনের পা দুটি আরও সামনে প্রসারিত করে বুকডন দেওয়ার মতো ভঙ্গি করছে, আবার কখনো নাচের মতো ছন্দময়ভাবে নাড়াচ্ছে। সামনের পা দুটি যেন এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে চায় না। অন্যদিকে মাঝের ও পেছনের চারটি পায়ের ওপর ভর করে দেহটিকে বেশ খানিকটা উঁচু করে রেখেছে। পা ছয়টিই লম্বা, সরু ও কালচে-বাদামি। তবে সামনের পায়ের অগ্রভাগ সাদা। পা দুটি ছড়িয়ে দিয়ে এমন ভঙ্গি করছে, যেন একটি বোলতা। তাই প্রথম দেখায় তাকে বোলতা বলে ভুল করেছিলাম।
কুড়ি বছরেরও বেশি আগে ধানখেতে পোকামাকড় শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময়ও এ ধরনের পোকা দেখে বিভ্রান্ত হতাম। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ধানখেত থেকে হাতজাল দিয়ে পোকামাকড় সংগ্রহ করে সেগুলো ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করার পর সাদা কাগজের ওপর রাখা হতো। এরপর প্রশিক্ষণার্থীদের সেগুলো বাছাই করতে বলা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমত, ধানগাছের নির্দিষ্ট বৃদ্ধিপর্যায়ে কী কী পোকামাকড় উপস্থিত থাকে, তা শনাক্ত করা। দ্বিতীয়ত, তাদের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে এবং ধানখেতের জন্য কোনটি উপকারী আর কোনটি ক্ষতিকর, তা নির্ধারণ করা।
পোকামাকড় বাছাইয়ের সময় এমন কিছু পতঙ্গ পাওয়া যেত, যেগুলো আমরা সহজে চিনতে পারতাম না। সেগুলোকে নিরপেক্ষ পোকাদের দলে রাখা হতো। অর্থাৎ ধানখেতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। এসব পোকাদের মধ্যে প্রায়ই এই লম্বা-পদী মাছির দেখা পেতাম। প্রথম দেখায় কখনো মনে হতো, এটি বোলতা। বোলতা হলে তাকে উপকারী পোকাদের দলে রাখা যেত। কিন্তু আতশি কাচ দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলে বোঝা যেত, এটি আসলে মাছি। মাছির সাধারণত এক জোড়া কার্যকর ডানা থাকে, আর বোলতার সাধারণত দুই জোড়া। বহুদিন পর রমনা উদ্যানে সেই পোকাটিকে দেখে পুরোনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। তবে এবার আর তাকে অচেনা মনে হলো না। এটি এক ধরনের লম্বা-পদী মাছি, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় স্টিল্ট-লেগড ফ্লাই (Stilt-legged fly)।
মাছি ডিপ্টেরা (Diptera) বর্গের অন্তর্ভুক্ত। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এক জোড়া কার্যকর ডানা থাকা। মশা-মাছিসহ আমাদের চারপাশে দেখা অনেক পরিচিত পতঙ্গই এই বর্গের সদস্য। পৃথিবীতে ডিপ্টেরা বর্গের বিপুলসংখ্যক প্রজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে মাইক্রোপেজিডি (Micropezidae) নামে একটি পরিবার রয়েছে। এই পরিবারের মাছিগুলো সাধারণভাবে স্টিল্ট-লেগড ফ্লাই বা লম্বা-পদী মাছি নামে পরিচিত। এদের পা অন্য অনেক মাছির তুলনায় লম্বা ও সরু। কিছু প্রজাতির সামনের পায়ের ভঙ্গি ও নড়াচড়া বোলতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
রমনা উদ্যানে দেখা মাছিটির ডানায় গাঢ় রঙের পট্টি বা ডোরার মতো নকশা ছিল। এ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এর বাংলা নাম দেওয়া যেতে পারে ‘ডোরা ডানার লম্বা-পদী মাছি’। তবে এর নির্দিষ্ট প্রজাতি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি। লম্বা-পদী মাছিদের মধ্যে ডানার নকশা, পায়ের গঠন ও দেহের রঙে প্রজাতিভেদে পার্থক্য দেখা যায়। তাই শুধু বাহ্যিক চেহারার ভিত্তিতে এর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিচয় নির্ধারণ করা কঠিন।
লম্বা-পদী মাছির দেহ সাধারণত সরু ও লম্বাটে হয়। মাথার দুই পাশে থাকে যৌগিক চোখ। পা ছয়টি, লম্বা ও চিকন। অনেক প্রজাতির পায়ে কালচে বা বাদামি রঙের পাশাপাশি হালকা রঙের বলয় দেখা যায়। ডানা সাধারণত স্বচ্ছ হলেও তাতে গাঢ় ছোপ, পট্টি কিংবা ডোরার মতো নকশা থাকতে পারে। ডানার এসব নকশা ও পায়ের গঠন প্রজাতি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
মাছিটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো সামনের পা দুটি অনবরত নাড়ানো। পা দুটি কখনো সামনে প্রসারিত করছে, কখনো একটির সঙ্গে অন্যটি ঠেকাচ্ছে, আবার কখনো ছড়িয়ে রাখছে। এ আচরণের কারণে তাকে অনেকটা বোলতার মতো দেখায়। কিছু পতঙ্গের ক্ষেত্রে অন্য প্রাণীর মতো দেখানোর বৈশিষ্ট্য শিকারিদের বিভ্রান্ত করতে এবং আত্মরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই মাছিটির সামনের পা নাড়ানোর সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
লম্বা-পদী মাছির বিভিন্ন প্রজাতির খাদ্যাভ্যাস ও জীবনচক্রে পার্থক্য রয়েছে। কিছু প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক মাছি ছোট পতঙ্গ শিকার করে। অন্য কিছু প্রজাতি পচনশীল জৈব পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশে দেখা যায়। এদের লার্ভা বা শূককীটের আবাসস্থলও প্রজাতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। মাটি, পচা উদ্ভিদাংশ কিংবা অন্যান্য জৈব পদার্থসমৃদ্ধ পরিবেশে কোনো কোনো প্রজাতির লার্ভা বেড়ে ওঠে।
রমনা উদ্যানে দেখা ক্ষুদ্র মাছিটি আবারও মনে করিয়ে দিল, পরিচিত পরিবেশের মধ্যেও কত বিচিত্র প্রাণী আমাদের চোখের সামনে বিচরণ করে। একটি পাতার ওপর বসে সামনের পা নাড়াতে থাকা ছোট্ট পতঙ্গও কৌতূহল জাগাতে পারে, ফিরিয়ে আনতে পারে বহুদিনের পুরোনো স্মৃতি।
আরও পড়ুন
ঔষধি উদ্ভিদ পূর্বী ভাঁট
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে দেখা পূর্বী ভাঁট। ছবি: লেখক
-->প্রকৃতির অরণ্য, পাহাড় ও ঝোপঝাড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ, যেগুলোর অধিকাংশের পরিচয় ও গুরুত্ব সাধারণ মানুষের অজানা। এসব উদ্ভিদের কিছু প্রজাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকজ চিকিৎসা ও খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। তেমন একটি উদ্ভিদ হলো হেয়াতি বা পূর্বী ভাঁট। উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এটি নেফাফু নামে পরিচিত। আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে উদ্ভিদটির ব্যবহার দেখা যায়। লোকজ চিকিৎসায়, বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গাছটির পাতা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে উদ্ভিদটির সন্ধান পাই।
পূর্বী ভাঁটের আদি বিস্তৃতি হিমালয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ চীন ও ইন্দোচীন পর্যন্ত। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মায়ানমার, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তৃতি রয়েছে। এ উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum colebrookeanum, এটি Lamiaceae পরিবারের উদ্ভিদ।
পূর্বী ভাঁট একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম বা ছোট উদ্ভিদ। অনুকূল পরিবেশে এটি কয়েক মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বিশেষ করে আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশে গাছটি ভালো জন্মে। গাছটির গঠন ঝোপালো হওয়ায় অন্যান্য গুল্মের সঙ্গে সহজেই মিশে থাকে। এর কাণ্ড শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত এবং কচি ডালপালা তুলনামূলকভাবে কোমল। গাছের শাখার অগ্রভাগে গুচ্ছবদ্ধভাবে ছোট ছোট ফুল ফোটে। ফুল সাধারণত সাদা বা হালকা সাদাটে রঙের। ফুলের বাইরে বেরিয়ে থাকা লম্বা পুংকেশর ফুলের গুচ্ছকে স্বতন্ত্র রূপ দেয়। ফুল ফোটার সময় গাছটি বেশ আকর্ষণীয় দেখায়। ফুলের পর ছোট মাংসল ফল তৈরি হয়। পরিপক্বতার সঙ্গে ফলের রং পরিবর্তিত হতে পারে। ফুল ও ফলের গঠন উদ্ভিদটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এ গাছের পাতাগুলো বেশ বড়, সাধারণত ডিম্বাকার থেকে হৃৎপিণ্ডাকৃতির। পাতার অগ্রভাগ সুচালো, কিনারা করাতের দাঁতের মতো খাঁজযুক্ত। পাতাগুলো কাণ্ডে বিপরীতক্রমে সাজানো থাকে। পাতার রং সবুজ। পাতা হাত দিয়ে ঘষলে একটি স্বতন্ত্র গন্ধ পাওয়া যায়, যা গাছটিকে শনাক্তে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু গন্ধ বা পাতার আকৃতি দেখে উদ্ভিদটির পরিচয় নিশ্চিত করা ঠিক নয়।
পূর্বী ভাঁট শুধু একটি বুনো গুল্ম নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। লোকজ চিকিৎসায় এর পাতা উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা ও কয়েকটি প্রদাহজনিত উপসর্গে ব্যবহারের কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ভিদটির রক্তচাপ-হ্রাসকারী প্রভাব নিয়ে পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণাও হয়েছে। এসব গবেষণায় কিছু জৈবসক্রিয় উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে গাছটির নির্যাস কীভাবে কাজ করে, মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কতটা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কী ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে, এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
লোকজ চিকিৎসায় উদ্ভিদটি ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর বিভিন্ন নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ কিছু জৈবসক্রিয় উপাদান শনাক্ত হয়েছে। প্রাথমিক গবেষণায় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত থাকলেও ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা ও নিরাপদ মাত্রা প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই একে ডায়াবেটিসের প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
উদ্ভিদটির নির্যাসের প্রদাহবিরোধী ও ব্যথা উপশমকারী বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে গবেষণাগার বা প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের চিকিৎসায় কার্যকর বলে ধরে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন।
বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ চিকিৎসায় পূর্বী ভাঁটের পাতা পেটের অস্বস্তি, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো সমস্যায় ব্যবহারের বিবরণ রয়েছে। কিছু জনগোষ্ঠী শারীরিক অন্যান্য সমস্যাতেও গাছটির বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে আসছে। এসব ব্যবহার ঐতিহ্যগত জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই।
পূর্বী ভাঁটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো খাদ্য হিসেবে এর ব্যবহার। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতিতে গাছটির কচি পাতা শাক হিসেবে রান্না করে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। কখনো পাতা সেদ্ধ করে, কখনো অন্য উপকরণের সঙ্গে মিশিয়ে রান্না করা হয়। এই ব্যবহার উদ্ভিদটির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পরিচয় বহন করে। তবে কোনো জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে উদ্ভিদটির প্রচলন থাকলেই সেটিকে সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ বা রোগ নিরাময়ে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া যায় না।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ
