২১ মিনিট আগে
![]()
শামীমা রীতা
ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন বিক্রি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এআই-চালিত প্রোগ্রাম বা ‘বট’ ব্যবহার করে ট্রেনের টিকিট বুকিং দিয়ে চড়া দামে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে রেলের টিকিট বিক্রির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেইউ’র বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে সহজের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে টিকিট কালাবাজারিতে সহজের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা শুরু করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
সহজ অবশ্য ইতোমধ্যে তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং সিস্টেমের একটি অডিটে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বেশ কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে টিকিট বিক্রির জন্য প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে।
এসব অডিট পর্যবেক্ষণ বা প্রশ্নের জবাবে 'সহজ' থেকে দেওয়া ব্যাখ্যার পর্যালোচনা করছে রেলওয়ে।
এদিকে, কিছু স্টেশনে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিচ্ছে রেলওয়ে।
পাশাপাশি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি টিকিটিং এজেন্সির জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান।
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গত সপ্তাহে তারা অডিট রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন। কিছু পর্যবেক্ষণে 'সহজের' নাম এসেছে। আর বাকিগুলো রেলের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগ সংশ্লিষ্ট।
তিনি বলেন, ব্যাখ্যা পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ১১ অক্টোবরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই সহজের যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত জবাব চাওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এতে অভিযোগ করা হয়, ‘বুকমাইরেলবিডিডটকম’ নামে একটি অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পরিচালিত 'বট' ব্যবহার করে চড়া দামে বিক্রি করতে বিপুল সংখ্যক টিকিট আটকে রাখা হতো।
সমন্বিত টিকিটিং চুক্তির অধীনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
গত ২০ অক্টোবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অডিটে দেখা গেছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই টিকিট আটকে রাখা বা হোল্ড করা সম্ভব ছিল।
এতে সতর্ক করে বলা হয়, সহজের কর্মীদের পরিচালিত অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ঠিকাদার প্রতিনিধি এবং রেলের বুকিং সহকারী বা টিকিট মাস্টারদের পারস্পরিক যোগসাজশে কালাবাজারি হয়ে থাকতে পারে।
আফজাল হোসেন বলেন, কোচ যোগ বা বিয়োগ করা এবং সিটের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য কিছু স্টেশনে সহজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের জন্য কিছু সুবিধা রাখা হয়েছিল। কিছু অ্যাকাউন্ট স্টেশন মাস্টারদের নামেও নিবন্ধিত ছিল।
'এসব কাজ এখন থেকে রেলওয়ের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের অধীনে নিয়ে আসা হচ্ছে,' বলেন তিনি।
টিকিট কালাবাজারিতে সহজের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, জানতে চাইলে রেল মহাপরিচালক বলেন, 'এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না এবং একাধিক বিষয়ে রেলওয়ে প্রমাণ পেয়েছে। আইটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরও আলোচনার পর পরবর্তী ব্যবস্থা ঠিক করা হবে।'
যোগাযোগ করা হলে সহজ লিমিটেডের সিইও লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) আমিনুল হক প্রতিষ্ঠানটির পিআর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে পিআর প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্কের মাধ্যমে ডেইলি স্টারকে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, রেলের পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছে সহজ।
বিবৃতিতে বলা হয়, নিরীক্ষায় উঠে আসা বিষয়গুলো চুক্তির শর্ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া তথ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে। সুতরাং, এ মুহূর্তে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
সহজ জানায়, তারা অডিট প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা বজায় রাখবে এবং যাত্রীসেবা, ডেটা নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কাজ করে যাবে।
কালাবাজারি রোধে রেলওয়ে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্লক করেছে বলে জানান ডিজি আফজাল।
এছাড়া, ওই অননুমোদিত ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অনুরোধ জানিয়েছে রেলওয়ে। গত ৮ অক্টোবর ওয়েবসাইটটি বন্ধ এবং টিকিটিং সিস্টেমের নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পরিচালিত নিরীক্ষায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। এতে অনলাইন টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমায় ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সহজের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না করার বিষয়টিও তুলে ধরা হয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।
গত ১৬ আগস্ট পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তর ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালকের কাছে ২২টি অডিট নথি পাঠায়।
আফজাল হোসেন বলেন, ধীরগতির সার্ভার, সিস্টেম বিকল হওয়া এবং অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে এর আগেও একাধিকবার সতর্ক ও জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্তু, জরিমানা সরাসরি আদায় না করে তাদের পাওনা বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হতো।
এদিকে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই যৌথ উদ্যোগের ৫ বছরের চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা। এর আগেই নতুন কোনো টিকিটিং সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে রেলওয়ে।
আফজাল হোসেন বলেন, দরপত্রের কাগজপত্র তৈরি হয়ে গেছে এবং আগামী সপ্তাহেই টেন্ডার আহ্বান করা হবে।
নতুন এজেন্সি নিয়োগের এ সিদ্ধান্ত 'সহজের' বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। তবে তিনি জানান, বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রেলওয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানকে এ কাজ দিয়ে দেবে।
