বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে একাধিক বড় বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের রপ্তানি আয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও জানুয়ারি-জুলাই সময়ে রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স, ভারত ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারেও রপ্তানি আয়ে পতন দেখা গেছে। এতে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের বাজার ধরে রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সব বাজারের পরিস্থিতি এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিকে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। আবার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সামগ্রিক রপ্তানি বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বাজারভিত্তিক পরিস্থিতি বোঝা জরুরি।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমে ১ হাজার ১৯২ কোটি ইউরো হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ, আয় কমেছে প্রায় ১৫৮ কোটি ইউরো বা ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার ইউরোপের সামগ্রিক বাজার সংকোচনের চেয়ে অনেক বেশি।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে স্পেন ও নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, ইউরোপের সব বাজারে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশের একক দেশভিত্তিক বৃহত্তম পোশাক রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমে ৪৬৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৪৯৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও কমেছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর রপ্তানি আরও বেশি কমেছে। তবে বাংলাদেশের রপ্তানিও কমে যাওয়ায় বাজারটির চাহিদা ও ক্রেতাদের ক্রয় সিদ্ধান্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অপ্রচলিত পোশাক রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে ভারত ও রাশিয়ায় উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ, আয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৭ লাখ ডলার। রাশিয়ায় রপ্তানি কমেছে ২৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ, আয় দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
একই অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর বাজারেও রপ্তানি কমেছে। এসব বাজার বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক পতন সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। ফলে পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে তা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ওই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, কানাডায় ৩ দশমিক ২০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়ে ৪৯০ কোটি ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের বাজারেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের রপ্তানি আয় কমলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে চাহিদা দুর্বল হলে নতুন ক্রয়াদেশ, পণ্যের দাম এবং কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে রপ্তানি কমার তথ্য থেকেই কর্মসংস্থান বা উৎপাদন কতটা কমেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; এ জন্য আলাদা শিল্পতথ্য প্রয়োজন।
রপ্তানি আয় বাড়াতে বাজার বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পণ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার দক্ষতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসার ব্যয় কমানো প্রতিযোগিতায় সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং ক্রেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করা। বড় বাজারগুলোর পতন মোকাবিলার পাশাপাশি যেসব দেশে রপ্তানি বাড়ছে, সেসব বাজারে সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে দেশের রপ্তানি আয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সহজ হবে।
