সংবাদ · স্বাস্থ্য
যশোর হাসপাতালের ২৪ বেডে ১২৬ শিশুর চিকিৎসা
১৯/১০/২০২৬

ঋতু বদলের পালায় এখন শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে। আর কিছুদিনের মধ্যেই দরজায় কড়া নাড়বে শীত। আবহাওয়ার এই হঠাৎ পরিবর্তনে ঘরে ঘরে বাড়ছে রোগবালাই। তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সুযোগ নিচ্ছে ভাইরাল ফিভার, সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে পেটের সমস্যা ও মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।যশোর জেনারেল হাসপাতালে মৌসুমি সর্দি, জ্বর, বমি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। একারণে শিশু ওয়ার্ডে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ২৪ বেডের বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ১২৬ জন শিশু। রোগীর ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত চাপের কারণে হাসপাতালে তীব্র শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শত শত রোগীকে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়ে সুস্থ থাকতে হলে সঠিক জীবনযাত্রা এবং বাড়তি সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে প্রতিদিন শতাধীক রোগী প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা নিরচ্ছস। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে করুণ চিত্র। সেখানে মাত্র ২৪টি বেডের বিপরীতে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১২৬ জন শিশু। বেড না পেয়ে অধিকাংশ শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই চিত্র দেখা গেছে, নিউনেটাল ব্লকেও। যেখানে মাত্র ১০ বেডের বিপরীতে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে ২৬ নবজাতক। পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের পরিস্থিতিও প্রায় একই রকম।ভুক্তভোগী যশোর সদর উপজেলার নূরপুর গ্রামের জ্যোৎস্না বেগম জানান, ১২ অক্টোবর থেকে তার দুই বছরের শিশু রেজাউলের প্রচণ্ড জ্বর, বমি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। শুধু রেজাউল নয়, আব্দল্লাহ (তিনমাস), আয়েশা (তিনবছর), ফারজানা (১৬ মাস) সাথীসহ অসংখ্য শিশু এখন এই ওয়ার্ডের মেঝেতে কাতরাচ্ছে।একই অবস্থা বড়দের ক্ষেত্রেও। পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মালঞ্চি গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, গত রোববার থেকে তার প্রচণ্ড জ্বর। স্থনীয় ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল খেয়ে কোনো কাজ না হওয়ায় তাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একইভাবে বমি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছেন সদর উপজেলার শেখহাটি বাবলাতলা এলাকার সিরাতুন মুনিরা। হাসপাতালে ভর্তির পর তারা এখন কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন।হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা জেসমিন খাতুন বলেন, ওয়ার্ডে ২৪টি বেড রয়েছে। এর মধ্যে শিশু ভর্তি আছে ১২৬জন। অতিরিক্ত শিশুদের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বর্তমানে শিশুদের কোনো ওষুধের সংকট নেই বলে তিনি জানান।যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক রহিমা আক্তার বলেন, হাসপাতাল ২৫০ শয্যার, তবে রোগী থাকছে ছয়শ জনের বেশি। এর মধ্যে বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগীও চিকিৎসা নিছে। সেবিকারা তাদের সাধ্যমত সেবা দিতে চেষ্টা করছে।এ বিষয়ে হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আব্দুস সামাদ বলেন, ঋতু পরিবর্তনের কারণে রোগবালাই বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ভাইরাল ইনফেকশন দ্রুত ছড়াচ্ছে। এ সময় পরিবেশ শুষ্ক থাকে, তাই বাতাসে ধুলোবালি, পরাগরেণু এবং আর্দ্রতা পরিবর্তনের কারণে অ্যালার্জি, ত্বকে র্যাশ এবং হাঁপানির টান বাড়ে।এছাড়া জলবাহিত রোগের মধ্যে ডায়রিয়া, জন্ডিস, ফুড পয়জনিং এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেশি দেখা যায়। আবার বর্ষা ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমানে জেলায় ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করছে বিশেষ করে কেশবপুর ও মণিরামপুর এলাকায়।তাই পরামর্শ হিসেবে ডাক্তার আব্দুস সামাদ অভিভাবকদের সচেতনতার সাথে শিশুদের বিশেষ যত্ন নিতে বলেছেন। শিশুদের জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো শরীর নরম কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে বারবার মুছে দিতে বলেছেন। একই সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। এই সময়ে গরম-ঠাণ্ডার কারণে শিশুদের নাক বন্ধ থাকা, বমি বমি ভাব বা খাবারে অরুচি হতে পারে, তাই পুষ্টিকর ও ডাবসহ তরল খাবারের প্রতি জোর দিতে অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন।যশোর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু হায়দার মনিরুজ্জামান বলেন, শিশুদের মতো বড়দেরও ভাইরাল ইনফেকশন দেখা দেয়। তবে বড়দের ক্ষেত্রে কিছুটা ক্রিটিক্যাল আকার ধারণ করে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, এ সময় ভাইরাল রোগের সাথে প্রেশারসহ বয়সজনিত অন্য রোগও দেখা দেয়। তাই এই সময় মাস্ক পরে বাইরে যেতে হবে।যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত বলেন, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমরা সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়েও সাধ্যমতো রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকায় মেঝেতে রেখেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। এই সময়ে সাধারণ জ্বর-সর্দি হলে আতঙ্কিত না হয়ে শুরুতেই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একইসাথে শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নিতে হবে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗