সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ভারসাম্যে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তাগিদ
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, সাংবাদিকদের পেশাগত ও নৈতিক মান উন্নয়ন এবং পাঠক-দর্শকের আস্থা পুনরুদ্ধারে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন গণমাধ্যমের অংশীজনরা। তারা বলেছেন,সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মালিকপক্ষের জবাবদিহি,সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রোববার (১৮অক্টোবর) সিলেটে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) আয়োজনে বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়ন এবং কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণের একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে এ সভার আয়োজন করা হয়।
খুলনা ও বরিশালের পর এটি এমআরডিআইয়ের তৃতীয় বিভাগীয় মতবিনিময় সভা। হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশ-এর অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভসের (সিএফএলআই) আওতায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সভায় সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান সূচনা বক্তব্যে বলেন, সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় নিজস্ব জবাবদিহি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেকাংশে পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। এই আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ সংস্কারের ক্ষেত্রে আংশিক ও সীমিত পরিবর্তনের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারি বিজ্ঞাপনের হার সামান্য বাড়ানো কিংবা ছোটখাটো বিধি সংশোধনের মতো পদক্ষেপ দিয়ে গণমাধ্যম খাতের গভীর সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। এসব সুপারিশে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। তাই বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করে সন্তুষ্ট থাকার সুযোগ নেই।
তিনি সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক পক্ষের চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা ছাড়া টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুস্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং পাঠক-দর্শকের জন্য সহজলভ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
চ্যানেল এসের পরিচালক (নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স) রেজোয়ানুল হক রাজা বলেন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবাদিকদের ন্যূনতম পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে হবে।
তিনি বলেন, যেসব সংবাদমাধ্যম কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে সক্ষম নয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাংবাদিকদের বেতন না দিলে তাদের অনৈতিক আয়ের পথ বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অপসাংবাদিকতা বন্ধে সাংবাদিকদের ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ এবং প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে নিজস্ব আচরণবিধি কার্যকর করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনা ও নীতিনির্ধারণী উদ্যোগে ঢাকার বাইরের সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা, কর্মপরিবেশ ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্ব-নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলার ওপর তারা জোর দেন।
এমআরডিআইয়ের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৫–২০৩০)-এর অংশ হিসেবে গণমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদের সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর; দৈনিক উত্তরপূর্বের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফখরুল ইসলাম; দৈনিক শ্যামল সিলেটের নির্বাহী সম্পাদক আবদুল মুকিত; দৈনিক যুগভেরীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অপূর্ব শর্মা; দৈনিক বৃহত্তর সিলেটের মানচিত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক ফয়সল আহমদ বাবলু; দৈনিক আগামীর সময়ের সিলেট ব্যুরোর আবাসিক সম্পাদক আহমেদ নূর; সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম; দৈনিক আধুনিক কাগজের সম্পাদক মঈন উদ্দিন; সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন; সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর; দৈনিক দেশবার্তার আঞ্চলিক সম্পাদক লিয়াকত শাহ ফরিদী; ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, সিলেটের সভাপতি মাহবুবুর রহমান রিপন; ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের (আইডিয়া) নির্বাহী পরিচালক নাজমুল হক; সিলেট যুব একাডেমির নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম ফয়সাল আহমেদ; শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জায়েদা শারমিন এবং পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালিদুর রহমান।
এ ছাড়া সভায় প্রতিদিনের বাণীর সম্পাদক মোহাম্মদ শাবান মিয়া, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহযোগী সম্পাদক এনাম আহমদ, দৈনিক প্রভাকরের প্রধান সম্পাদক শোয়েব চৌধুরী এবং ইফোর্টস ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টের (ইরা) প্রধান উপদেষ্টা ড. সাইকী ইসলাম অংশ নেন।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাগত নৈতিকতা ও জবাবদিহিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সাংবাদিকতার মান উন্নয়নের পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
