কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার নিয়ে অনিয়ম, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, কোথাও আত্মীয়তার সম্পর্ক, আবার কোথাও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পছন্দের ব্যক্তিদের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিÑ কেউই দায়মুক্তি পেতে পারেন না। বিশেষ করে যেসব আমলার বিরুদ্ধে সার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ, অনিয়মে সহযোগিতা কিংবা অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাজশাহী, মেহেরপুর, নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও নিকটাত্মীয়দের নাম এসেছে, কোথাও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা। এমনকি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে যেসব আমলার বিরুদ্ধে সার সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা, পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগে প্রভাব বিস্তার কিংবা আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রশাসনিক পদমর্যাদা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না।
আশার খবর হলো, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তালিকায় তথ্যের গরমিল থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরই তার দায় নিতে হবে, আমরা আশা করছি, শুধু বক্তব্য দিয়ে চুপ থাকবে না কৃষি মন্ত্রণালয়। তালিকা তৈরির সুপারিশ থেকে শুরু করে যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার কী ভূমিকা ছিল, তা শনাক্ত করতে হবে। কোথাও অর্থ লেনদেন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য ও নথিপত্র পরীক্ষা করে অর্থের উৎস, গ্রহীতা এবং মধ্যস্থতাকারীদের চিহ্নিত করতে হবে।
সারের ডিলার নিয়োগ কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার কিংবা আত্মীয়স্বজনের কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত নয়। এটি কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। এখানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রতিষ্ঠা পেলে তার মাশুল দিতে হবে কৃষককে। অসাধু ডিলারদের হাতে সরবরাহব্যবস্থা জিম্মি হলে কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। এর প্রভাব পড়বে ফসল উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের বাজারে। ফলে ডিলার নিয়োগের অনিয়মকে নিছক প্রশাসনিক বিতর্ক হিসেবে দেখার অবকাশ নেই; এটি কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আমরা মনে করি, বিতর্কিত নিয়োগের তালিকা পুনরীক্ষণ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। গুরুতর অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট নিয়োগ স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য অনিয়মের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া নয়, বরং দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির মুখোমুখি করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিশেষ করে সার সিন্ডিকেটের সঙ্গে কোনো আমলার যোগসাজশ প্রমাণিত হলে, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা ক্ষমতার বলয়Ñ কোনোটিই যেন দায়মুক্তির ঢাল না হয়। কৃষকের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং সরকারি দায়িত্বকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার পরিণতি যে কঠিন, তা স্পষ্ট করে দিতে হবে। সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে শুধু তালিকা সংশোধন নয়, সিন্ডিকেটের নেপথ্যের হোতাদেরও আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।