দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রতিবাদে তীব্র গণবিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা ফ্রান্স। শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির একাধিক শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তুমুল সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, বিশৃঙ্খলা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সংঘাতের একপর্যায়ে এক আন্দোলনকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে ১৩০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করেছে পুলিশ।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি জানিয়েছে এই কর্মসূচিতে দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। তবে বিক্ষোভকারীদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
প্যারিসের রাস্তায় বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ছোড়ে পুলিশ। জবাবে বিক্ষোভকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। এছাড়া রাজধানীর বিখ্যাত শঁজেলিজে সড়কে প্রায় তিন শতাধিক আন্দোলনকারী অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালালে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে তাদের আটকে দেয় পুলিশ। এ সময় আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন।
সহিংসতায় দক্ষিণাঞ্চলীয় সাঁত-এতিয়েন শহরে ভিড় সামলাতে পুলিশের ব্যবহৃত গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক পুরুষ বিক্ষোভকারীর হাত উড়ে গেছে বলে এএফপিকে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র। এর আগে গত ৫ অক্টোবর লঁস শহরেও পুলিশের ছোড়া স্টান গ্রেনেডের আঘাতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।
বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অঞ্চলেও। লিওঁ শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া মার্সেই ও লিলের নগর ভবনেও হামলা চালানো হয়েছে। মার্সেইয়ের বিলাসবহুল ব্র্যান্ড হার্মেস এবং লিলের অ্যাপল স্টোরসহ বেশ কয়েকটি শহরের বহু দোকানে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়।
কিছু স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও মূল মিছিলগুলো ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ। সেখানে পরিবার-পরিজন ও শিশুসহ নানা বয়সের মানুষের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেন, "বিক্ষোভকারীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতে চাইলেও ভাঙচুরের ঘটনা তাদের প্রতিবাদকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।"
সাধারণ মানুষের এই অসন্তোষের মূল কারণ জীবনযাত্রার ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ নানা বৈশ্বিক সংকটে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ফ্রান্সেও জনজীবনে তীব্র অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অনাস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ১৮ বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষার্থী বলেন, "আসন্ন নির্বাচন, রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার এবং অতিধনীদের ক্রমবর্ধমান সম্পদ নিয়ে ক্ষোভ থেকেই তিনি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।"
প্রায় আট বছর আগে জ্বালানি তেলের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল দেশটির ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে ‘ইয়েলো অ্যান্ড ইয়ুথ’ ব্যানারে শনিবারের এই রাজপথের ডাক দেওয়া হয়। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে চলমান এই অসন্তোষ ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরও উসকে দিয়েছে।
